বিএনপি-যুবদল-ছাত্রদল নেতাদের সিন্ডিকেটের অধীনে চলছে মেঘনায় মা ইলিশ আহরণের মহোৎসব
অনলাইন নিউজ ডেক্স
ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকার গত ৮ই অক্টোবর থেকে ২৯শে অক্টোবর পর্যন্ত মেঘনা নদীতে ইলিশসহ সব প্রজাতির মাছ আহরণ, পরিবহন ও বিপণন নিষিদ্ধ করেছে। তবে এই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগর উপজেলার বিভিন্ন মাছঘাটে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে একাধিক সিন্ডিকেটের অবাধে মা ইলিশ শিকারের অভিযোগ উঠেছে।
প্রশাসনের ঢিলেঢালা অভিযানের সুযোগে মেঘনায় মা ইলিশ ধরাকে ঘিরে রীতিমতো উৎসব চলছে বলে স্থানীয়দের দাবি। স
ন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত এসব ইলিশ কেনার জন্য অপেক্ষা করেন শত শত ব্যবসায়ী।সরেজমিনে উপজেলার কয়েকটি মাছঘাট ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
রামগতি উপজেলার বিবিরহাট, ওছখালী, ব্রিজঘাট, আসলপাড়া, টাঙ্কিরঘাট, আলেকজান্ডার, বালুরচর ও বাংলা বাজার এবং কমলনগর উপজেলার মতিরহাট, নবীগঞ্জ, নাজিরগঞ্জ, মাতাব্বরহাট, লুধুয়া ও পাটারিরহাট এলাকার মেঘনার বিভিন্ন পয়েন্টে নির্বিচারে মা ইলিশ শিকার চলছিল।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সন্ধ্যার পর রামগতি বাজার মাছঘাটের পাশের মান্তাপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মাছ কেনার জন্য বহু ব্যাপারী অপেক্ষা করছেন। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে কয়েকজন ব্যাপারী মোটরসাইকেল নিয়ে দ্রুত সেখান থেকে পালিয়ে যান।
এ সময় স্থানীয় জেলে ও মাছের ব্যাপারীরা জানান, বিকেলে ৮ থেকে ১০টি নৌকা মাছ ধরতে নদীতে যায়। সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে মাছ নিয়ে সেগুলো ঘাটে ফিরে আসে।
জেলেদের ফেরার অপেক্ষায় সেখানে ক্রেতা ও ব্যাপারীরা দাঁড়িয়ে থাকেন। এ ছাড়া রাতভর আরও ১২ থেকে ১৫টি নৌকা মাছ ধরে ভোরে ঘাটে আসে। তখন লোকসমাগম আরও বেড়ে যায়।
এসব নৌকা কারা পরিচালনা করে—এমন প্রশ্নে সেখানে থাকা তিনজন ব্যাপারী জানান, নৌকাগুলো লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম, বিএনপির কর্মী ডলার নোমান এবং হালিম মাঝির নিয়ন্ত্রণে চলে।
কমলনগরের মতিরহাট মাছঘাটেও চরকালকিনি ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি হুমায়ুন কবির ও ফারুক হোসেনের নেতৃত্বে ৫ থেকে ৭টি নৌকা নদীতে মা ইলিশ শিকার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নামলেই মা ইলিশ ধরার তৎপরতা শুরু হয়, যা চলে সারা রাত। রাতের আঁধারে কয়েকটি নৌকা ও ট্রলার নিয়ে জেলেরা ঝাঁকে ঝাঁকে মেঘনায় নামেন।
তাদের অভিযোগ, নদীতে মাছ ধরতে নামা জেলেদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে ছাত্রদল নেতা জাহাঙ্গীর, ডলার নোমান ও হালিম মাঝির সিন্ডিকেট তাদের মাছ শিকারে সহায়তা করে।
প্রতিদিন গড়ে ছোট-বড় ও মাঝারি মিলিয়ে প্রায় ৩০টি নৌকা মেঘনায় মাছ ধরে। রামগতি বাজার মাছঘাটের পাশের মান্তাপাড়া এলাকায় জাহাঙ্গীরের পরিচালিত এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে চরগাজী ও বড়খেরী ইউনিয়ন ছাত্রদল এবং যুবদলের কয়েকজন নেতাও জড়িত বলে জানিয়েছেন ওই এলাকার দুই বিএনপি নেতা।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, এসব কথা বললে সমস্যা হয়। দলের নেতাকর্মীরা এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন যে কেউ কারও কথা শুনতে চান না।
তাদের দাবি, মৎস্য অফিস ও নৌ পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ না করে এ ধরনের কাজ করা সম্ভব নয়।
মাছ কিনতে আসা সিরাজ উদ্দিন ও রফিক মাঝি জানান, নিষেধাজ্ঞার সময়ে তারা প্রায়ই এই স্থান থেকে মাছ কিনছেন। তাদের মতো আরও প্রায় ২০০ ব্যাপারী নিয়মিত মাছ কেনেন।
তাদের মতে, পেটের দায় ও ঋণের চাপে জেলেরা নদীতে নামতে বাধ্য হচ্ছেন। পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে ‘ম্যানেজ’ করার দায়িত্বে ছাত্রনেতা জাহাঙ্গীর আলম, ডলার নোমান ও হালিম মাঝি রয়েছেন বলেও তারা দাবি করেন।
রামগতি বাজারের স্থানীয় ব্যবসায়ী ফজল করিম ও আবির হোসেনের অভিযোগ, এ বছর মা ইলিশ শিকার ঠেকাতে নিষেধাজ্ঞার সময় প্রশাসনের তৎপরতা নজিরবিহীনভাবে ঢিলেঢালা।
তাদের দাবি, আগের বছরগুলোতে প্রশাসনের কড়াকড়ি ছিল বেশি; এবার তা না থাকায় নির্বিচারে ইলিশ ধরা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, মা ইলিশ সংরক্ষণে সরকার ৮ই অক্টোবর থেকে ২৯শে অক্টোবর পর্যন্ত চাঁদপুরের ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত মেঘনার ১০০ কিলোমিটার এলাকাসহ দেশের সব নদ-নদীতে ইলিশ আহরণ, পরিবহন ও বিপণন নিষিদ্ধ করেছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে ছাত্রদল নেতা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, রাজনীতি করার কারণে তার পক্ষে ও বিপক্ষে শত্রু রয়েছে। তারা এমন অভিযোগ করলেও করতে পারে, তবে তিনি এই কাজের সঙ্গে জড়িত নন।
রামগতি উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক শিবলী নোমান বলেন, সরকারি আইন অনুযায়ী ২২ দিন মাছ ধরা নিষিদ্ধ। এ সময়ে কেউ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নদীতে মাছ শিকারে সহায়তা করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। এতে তাদের কোনো আপত্তি নেই।
তার ভাষায়, “অপরাধীর পরিচয় অপরাধী।”
রামগতির বড়খেরী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মোহাম্মদ আলী বলেন, জনবল সংকটসহ নানা কারণে বিশাল এই নদী পাহারা দেওয়া কঠিন। তা সত্ত্বেও নৌ-পুলিশের সদস্যরা সাধ্য অনুযায়ী অভিযান চালাচ্ছেন।
তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
