রাশিয়া কেন বেলারুশে আরও পারমাণবিক অস্ত্র পাঠাল?


রাশিয়া কেন বেলারুশে আরও পারমাণবিক অস্ত্র পাঠাল?
আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দিয়ে পারমাণবিক শক্তি প্রদর্শনে মেতেছে রাশিয়া ও তার অন্যতম প্রধান মিত্র বেলারুশ। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রাশিয়ার কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের যৌথ মহড়ায় অংশ নিয়েছেন বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো। পূর্ব ইউরোপ থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিশাল সামরিক মহড়া পরিচালনা করেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও লুকাশেঙ্কো। এতে রাশিয়ার শত শত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী যান, যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ এবং পারমাণবিক সাবমেরিন অংশ নেয়, যা ন্যাটোর সঙ্গে চলমান চরম উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মহড়ার পর এক বিবৃতিতে বেলারুশের ৭১ বছর বয়সি প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো জানান, তারা কাউকে হুমকি দিচ্ছেন না, তবে যেকোনো মূল্যে বেলারুশের ব্রেস্ট থেকে রাশিয়ার ভ্লাদিভোস্টক পর্যন্ত বিস্তৃত অভিন্ন পিতৃভূমি রক্ষা করতে তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ‘ইউরোপের শেষ স্বৈরাচার’ হিসেবে পরিচিত লুকাশেঙ্কো রাশিয়ার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়েও নিজের সব রাজনৈতিক গুটি এক চালের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না। দীর্ঘদিন ধরে মস্কোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা ভোগ করলেও পুতিনের সঙ্গে বেলারুশকে একীভূত করার প্রচেষ্টা তিনি বরাবরই এড়িয়ে গেছেন। এমনকি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেলারুশের সম্পর্কের একধরনের উষ্ণতাও দেখা গেছে। এদিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এই মহড়ার গুরুত্ব তুলে ধরে জানান, কৌশলগত পারমাণবিক বাহিনীর প্রস্তুতির স্তর আরও বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। চলমান ইউক্রেন যুদ্ধের চার বছরের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এই মহড়া সাজানো হয়েছে। মহড়ার অংশ হিসেবে ‘ইয়ার্স’ নামক আন্তঃমহাদেশীয় হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয়, যা মাত্র ২০ মিনিটেরও কম সময়ে প্রায় ৫,৭৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। এছাড়া মস্কো বেলারুশকে আধুনিকায়িত এসইউ-২৫ যুদ্ধবিমান এবং ৫০০ কিলোমিটার পাল্লার ইস্কান্দার-এম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে। ইউক্রেন সীমান্ত থেকে মাত্র ২০০ কিলোমিটার দূরে আসিপোভিচি সামরিক ঘাঁটিতে রাশিয়ার এই পারমাণবিক অস্ত্রগুলো মজুত রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। হঠাৎ কোনো বাহ্যিক কারণ ছাড়াই রাশিয়ার পক্ষ থেকে বেলারুশে পারমাণবিক অস্ত্র পাঠানো এবং এই যৌথ মহড়াকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জার্মানির ব্রেমেন ইউনিভার্সিটির গবেষক নিকোলে মিত্রোখিন আল জাজিরাকে জানান, পর্দার আড়ালে বড় কিছু একটা ঘটছে যা বিশ্বরাজনীতি ও গণমাধ্যমের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে। অন্যদিকে, ন্যাটোর নতুন মহাসচিব মার্ক রুট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে মস্কো পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করলে ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া হবে অত্যন্ত বিধ্বংসী। সুইডেনের হেলসিংবার্গে ন্যাটো পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের শীর্ষ সম্মেলনকে লক্ষ্য করেই রাশিয়া ও বেলারুশ এই মহড়ার সময় নির্ধারণ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চল এবং রাজধানী কিয়েভে নতুন করে বড় ধরনের হামলা চালানোর অংশ হিসেবেই রাশিয়া বেলারুশকে এই আগ্রাসনে টেনে আনছে। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে বেলারুশে অবস্থানরত রুশ সেনাবহর নতুন কোনো আক্রমণের জন্য পর্যাপ্ত নয়। কিয়েভ-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্কের প্রধান ভলোদিমির ফেসেনকো মনে করেন, ইউক্রেন যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়া লুকাশেঙ্কোর জন্য হবে আত্মঘাতী এবং তিনি এই ঝুঁকি এড়াতে চাইবেন। অনেক পর্যবেক্ষক এই মহড়াকে কেবলই পশ্চিমাদের ভয় দেখানোর জন্য রাশিয়ার ‘অস্ত্রের ঝনঝনানি’ বা ফাঁকা আওয়াজ বলে অভিহিত করেছেন। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই উত্তেজনার আড়ালে কিয়েভ ও মিনস্কের মধ্যে সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করার একটি ভিন্ন কৌশল থাকতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বেলারুশের ওপর পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। এই অর্থনৈতিক সংকট থেকে বাঁচতে লুকাশেঙ্কো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগ দিয়ে ওয়াশিংটনের সাথে সংলাপের চেষ্টা করছেন। যুদ্ধের পর ইউক্রেনের সাথে বেলারুশের সম্পর্ক কোন শর্তে স্বাভাবিক হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে বিশ্লেষকদের একাংশ সতর্ক করে বলেছেন, একনায়কদের সিদ্ধান্ত সবসময়ই অনিশ্চিত, তাই বেলারুশের এই যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার ক্ষীণ ঝুঁকি এখনো শেষ হয়ে যায়নি। সূত্র: আল-জাজিরা।