লোডশেডিং আড়াই হাজার মেগাওয়াট, জ্বালানি সংকটে বন্ধ ৩৫ বিদ্যুৎকেন্দ্র
অনলাইন নিউজ ডেক্স
দেশজুড়ে দিন-রাত মিলিয়ে সর্বোচ্চ আড়াই হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। একই সময়ে দেশের ৩৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় সেগুলো একযোগে অচল থাকার কারণ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
পিডিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকার পেছনে বড় কারণ জ্বালানির ঘাটতি। গ্যাসের জোগান পর্যাপ্ত না হওয়ায় গ্যাসচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে চাইলেও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। তরল জ্বালানির ক্ষেত্রেও একই ধরনের সংকট রয়েছে। এ ধরনের জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন চালাতে হলে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হয়।
বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমানে ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হচ্ছে প্রায় ২৫ টাকা। কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রে এই খরচ ১৩ থেকে ১৪ টাকা, আর গ্যাসচালিত কেন্দ্রে প্রায় ৭ টাকা।
অর্থাৎ, গ্যাস ব্যবহার করে তুলনামূলক কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। তবে দেশে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান তিনি।
ওই কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশীয় উৎস থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। আমদানি করা এলএনজি থেকে আসে আরও ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। কোনো উৎস থেকেই তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ নেই।
দেশের স্থলভাগে নতুন গ্যাসের সন্ধান মেলেনি; পাশাপাশি আমদানি করা গ্যাসের পরিমাণ বাড়ানোর মতো অবকাঠামোও নেই।
গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট চাহিদা প্রতিদিন ২ হাজার ৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু বুধবার, ৭ই অক্টোবর, সরবরাহ করা হয়েছে ৮৯৫ মিলিয়ন ঘনফুট। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাসের জোগান বাড়ালে শিল্প খাতে ঘাটতি তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে রপ্তানিতে।
এই আশঙ্কায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য চাইলেও গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছে না।
পিডিবির ৭ই অক্টোবরের উৎপাদন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গ্যাসের অভাবে ছয়টি কেন্দ্র বা ইউনিট বন্ধ ছিল। ঘোড়াশালের চারটি ইউনিটই অচল; সেগুলোর সম্মিলিত উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ১৫৩ মেগাওয়াট।
এ ছাড়া ভেড়ামারার ৪১০ মেগাওয়াট, বাঘাবাড়ীর ৭১ মেগাওয়াট এবং সিরাজগঞ্জের ২২৫ মেগাওয়াটের তিনটি ইউনিটও বন্ধ ছিল। এই কেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা ১ হাজার ৩৯৫ মেগাওয়াট।
তরল জ্বালানির সংকটে তিনটি কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়নি। সেগুলো হলো গোপালগঞ্জের ১০০ মেগাওয়াট, চৌমুহনীর ১১৩ মেগাওয়াট এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্র। তিনটির মোট উৎপাদনক্ষমতা ৩১৩ মেগাওয়াট।
রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলায় আরও ছয়টি কেন্দ্র বা ইউনিট থেকে উৎপাদন সম্ভব হয়নি। এই তালিকায় রয়েছে সিদ্ধিরগঞ্জের ২১০ মেগাওয়াট, টঙ্গীর ৮০ মেগাওয়াট, আশুগঞ্জ ইস্টের ৪০০ মেগাওয়াট এবং বড়পুকুরিয়ার ২৫০ ও ২৭৪ মেগাওয়াটের দুটি কেন্দ্র। সব মিলিয়ে এগুলোর সক্ষমতা ১ হাজার ৩৩৯ মেগাওয়াট।
চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় হরিপুরের ৩৬০ মেগাওয়াট, মেঘনাঘাটের ৪৫০ মেগাওয়াট এবং ভেড়ামারার ২০ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে পিডিবি বিদ্যুৎ নিচ্ছে না। এই তিন কেন্দ্রের সম্মিলিত সক্ষমতা ৮৩০ মেগাওয়াট।
অন্যদিকে, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে শাহজীবাজারের ১০০ মেগাওয়াট গ্যাস টারবাইন কেন্দ্রটি বন্ধ রয়েছে।
এ ছাড়া বন্ধ থাকা কেন্দ্রের তালিকায় রয়েছে হরিপুরের ৩২ মেগাওয়াট, চট্টগ্রামের ৪২০ মেগাওয়াট, সিকলবাহা পিকিংয়ের ১৫০ মেগাওয়াট, সিলেটের ২০ মেগাওয়াট এবং সৈয়দপুরের ১৫০ মেগাওয়াট কেন্দ্র। কয়লাচালিত বড়পুকুরিয়ার সব ইউনিটও বন্ধ রয়েছে।
পিজিসিবির হিসাবে, ৬ অক্টোবর দিবাগত রাত ১টায় দেশে লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৪০ মেগাওয়াট। পরদিন সকাল ৮টায় তা কমে দাঁড়ায় ৮৫৯ মেগাওয়াটে। এরপর আবার বাড়ে; বিকেল ৪টায় লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১৬১ মেগাওয়াট।
এ বিষয়ে পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বি.ডি. রহমত উল্লাহ বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনা অনুসরণ করা হয়নি। ফলে কেন্দ্র থাকলেও জ্বালানির অভাবে সেগুলো চালানো যাচ্ছে না।
তাঁর মতে, দেশে প্রাথমিক জ্বালানির মজুত নেই বললেই চলে, আর যা আছে তা খুবই সীমিত। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বের অনেক দেশ দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা ব্যাটারিতে জমা রাখে, যাতে রাতে ব্যবহার করা যায়। বাংলাদেশেও এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। সে জন্য সরকারের প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা তৈরি করে সেই অনুযায়ী এগোনো।
