মা নেই, বাবার পরিচয় নেই—হামে একে একে ঝরে গেল ছোটমণি নিবাসের ৫ শিশুর প্রাণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স
সাদা কাফনে মোড়ানো ছোট মরদেহটির ওপর রাখা কাগজে একটি রেজিস্ট্রেশন নম্বর। ওই কাগজে লেখা আছে নাম মাহির, বয়স ৮ মাস। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কাছে দেয়াল ঘেঁষে রাখা ছিল মরদেহটি। শুক্রবার ভোর থেকে মাহিরের লাশ এখানেই ছিল।
মাহির হাম ও হাম-পরবর্তী নানা জটিলতায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যায় বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে। এরপর তার মরদেহ ঢাকা মেডিকেলে আনা হয়।
শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বেসরকারি সংস্থা আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের দাফন সেবা অফিসার কামরুল আহমেদ মরদেহটি নিয়ে যান জুরাইন কবরস্থানে। সেখানে বেওয়ারিশ হিসেবে তাকে দাফন করার কথা। এর আগে মাহিরের ঠিকানা ছিল রাজধানীর আজিমপুরে সরকারের ছোটমণি নিবাস।
জন্মের পর শরীরের তুলনায় তার মাথাটি ছিল অনেক বড়। কাশিমপুর থানার মাধ্যমে গাজীপুরের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের আদেশে গত জানুয়ারি মাসে সে এই নিবাসে আসে।
মাহিরের মরদেহটি এত ছোট ছিল যে জরুরি বিভাগের সামনে অপেক্ষমাণ অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত নেওয়ার সময় খাটিয়ারও প্রয়োজন পড়েনি। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের ক্যারিয়ার মো. কিসমত দুই হাতে কোলে নিয়েই হাঁটা দেন।
সকালে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, এসি থেকে মেঝেতে পানি পড়ছে। মরদেহ রাখার জন্য সেখানে কোনো ফ্রিজ নেই। পুরো কক্ষে মোট তিনটি মরদেহ (একটি সাদা প্যাকেটবন্দী) থাকায় বোঁটকা গন্ধ। মাহিরের মরদেহ হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় উপস্থিত ছিলেন ছোটমণি নিবাসের উপতত্ত্বাবধায়ক তানজিনা আফরিন, প্রতিষ্ঠানটির অফিস সহকারী আয়েশা বেগম এবং হাসপাতালের সমাজসেবা কর্মকর্তা মহসিন কবির।
বিভিন্ন নথি ঠিকঠাক করতে করতে আয়েশা বেগম বলেন, তিনি ২০২২ সাল থেকে নিবাসে কর্মরত। এর আগে কখনো কাছাকাছি সময়ে এত শিশুর মৃত্যু দেখেননি।
উপতত্ত্বাবধায়ক তানজিনা আফরিন ও দাফন সেবা অফিসার কামরুল আহমেদ মরদেহ হস্তান্তর সংক্রান্ত নথিতে সই করা শেষ করেন। এরপর মরদেহ তোলা হয় অ্যাম্বুলেন্সে, রাখা হয় পেছনের আসনে। নিবাসের প্রতিনিধিরা হাসপাতাল থেকেই বিদায় নেন।
কামরুল আহমেদ ও মো. কিসমত বসেন অ্যাম্বুলেন্সের সামনের আসনে। কাফনের কাপড় খুলে মাহিরের মুখ শেষবারের মতো দেখা, কান্না করা বা মরদেহ জড়িয়ে ধরে বসার জন্য কোনো স্বজন সেখানে ছিলেন না।
এক মাস ধরে দায়িত্ব পালন করা তানজিনা আফরিন জানান, হাম, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে মাহিরকে প্রথমে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রায় দুই মাস ভর্তি ছিল সে।
৫ই জুলাই বিকেলে তাকে নিবাসে আনা হয়। পরদিনই আবার জটিলতা দেখা দিলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়, চিকিৎসক ভর্তি করতে বলেন। ভর্তির পর ৯ই জুলাই বৃহস্পতিবার অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে তার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) লাগবে বলে জানানো হয়। তখন তাকে তেজগাঁও এলাকার কিউর স্পেশালাইজড হাসপাতালে হামের জন্য বিশেষায়িত আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানেই শিশুটি মারা যায়।
পরে শুক্রবার ভোরে তাকে ঢাকা মেডিকেলে এনে রাখা হয়।
তানজিনা আফরিন বলেন, মাহিরের মৃত্যু নিয়ে কারও কোনো অভিযোগ না থাকায় তেজগাঁও থানায় সাধারণ ডায়েরি করা, বিনা ময়নাতদন্তে মরদেহ হস্তান্তরের জন্য আবেদন করা এবং আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামকে মরদেহ দাফনের বিষয়ে জানানোসহ বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়েছে।
সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে পিতৃ-মাতৃ পরিচয়হীন শূন্য থেকে ৭ বছর বয়সী পরিত্যক্ত বা পাচার থেকে উদ্ধার করা শিশুদের ছোটমণি নিবাসে লালন-পালন করা হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, খুলনা ও বরিশালে একটি করে মোট ছয়টি ছোটমণি নিবাস রয়েছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) সমীর মল্লিক বলেন, হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর থেকে মাহিরসহ হাম ও হাম-পরবর্তী নানা জটিলতায় ঢাকার আজিমপুরের নিবাসের মোট পাঁচ শিশু মারা গেছে। এই মুহূর্তে নিবাসের আর কোনো শিশু হামজনিত জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি নেই। অন্য কোনো নিবাসেও হামে কোনো শিশু মারা যায়নি।
জনবল সংকটসহ নানা সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে সমীর মল্লিক বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখারও চেষ্টা করা হয়েছে। তারপরও কয়েকজনকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
আজিমপুরের ছোটমণি নিবাসের প্রায় ২০ শিশুকে হাম, হাম-পরবর্তী জটিলতা ও বসন্তের জন্য বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা করানো হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
মুনার বয়স হয়েছিল মাত্র ৩ মাস ১৮ দিন। তার মা ছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ২২শে জুন হাম ও হাম-পরবর্তী জটিলতায় মুনা মারা যায়। গত ৫ই মার্চ মুনার জন্ম হয়েছিল ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে। ১২ই মার্চ তাকে উদ্ধার করা হয়েছিল।
গত ১লা জুন প্রথম আলো পত্রিকায় ‘মাকে খুনের অভিযোগে বাবা কারাগারে, ছোট খুশবুর লাশ মর্গে’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এটি ছিল ৯ মাস বয়সে হাম ও হাম-পরবর্তী জটিলতায় ৩১শে মে রাতে মারা যাওয়া খুশবুর জীবনের গল্প।
খুশবুর মা খুন হওয়ার পর তার বাবা যখন কারাগারে যান, তখন তাদের ৪৫ দিন বয়সী মেয়ের নামটা পর্যন্ত রাখা হয়নি। তাকে দেখভালের জন্য কোনো আত্মীয়স্বজনও পাওয়া যায়নি। আদালতের আদেশে মা-হারা শিশুটির ঠাঁই হয়েছিল ছোটমণি নিবাসে, সেখানেই তার নাম রাখা হয় খুশবু।
খুশবু বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে মারা যায়। খুন হওয়া মা তাজ নাহারের আরেক মেয়ে মারিয়ার বয়স ৭ বছর। গত বছরের ৩১শে জুলাই ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এক আদেশে বলেন, তাজ নাহারের দুই মেয়ের সার্বিক কল্যাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খুশবুকে (৪৫ দিন বয়সী মেয়ে) ছোটমণি নিবাস এবং মারিয়াকে তেজগাঁও সরকারি শিশু পরিবারে পাঠানোর পর প্রবেশন কর্মকর্তা বিষয়টি তত্ত্বাবধান করবেন।
খুশবুকে শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল গত ১০ই মে। হামের জন্য বিশেষ আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায় ৩১শে মে রাতে। তার মৃত্যুসনদে বাবার নামের জায়গায় লেখা ছিল ছোটমণি নিবাসের নাম।
খুশবুর মৃত্যুর পর আদালতের মৌখিক আদেশে লাশের সুরতহাল ও থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল। আদালতের আদেশে রায়েরবাজার শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ-সংলগ্ন কবরস্থানে দাফনের পর আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম কবরটি চিহ্নিত করে রাখে।
গত ৩০শে এপ্রিল একই দৈনিকে ‘হামে মারা যাওয়া ছোট আরিশার দাফন হবে বেওয়ারিশ হিসেবে’ শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
আরিশার বয়স হয়েছিল এক বছরের একটু বেশি। সে হাম ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। আরিশার মৃত্যুসনদেও তার নামের পাশাপাশি ঠিকানার জায়গায় লেখা ছিল নিবাসী শিশু। রাজবাড়ীর পাংশা থেকে যখন আরিশাকে উদ্ধার করে ছোটমণি নিবাসে পাঠানো হয়, তখন তার বয়স ছিল প্রায় এক মাস।
মাত্র ৫ মাস বয়সী মেহেদী মারা যায় ৩রা মে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে। নিবাসের কর্মীরা জানান, জন্মের পর এক দিন বয়সে সড়ক থেকে তাকে উদ্ধার করে নিবাসে পাঠানো হয়েছিল। তখন থেকেই অপুষ্ট ও অসুস্থ ছিল শিশুটি। এরপর হাম ও হাম-পরবর্তী জটিলতায় দফায় দফায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল, তবে বাঁচানো যায়নি মেহেদীকেও।
তারও কোনো পরিবার বা দাবিদার না থাকায় নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যুর পর পুলিশি কেস হয়। পুলিশ তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়, এরপর বেওয়ারিশ হিসেবে তার দাফন হয়।
নিবাসের উপতত্ত্বাবধায়ক তানজিনা আফরিন বলেন, এক জায়গায় নানা বয়সী অনেক শিশু (বর্তমানে নিবাসে আছে ৩৮ শিশু) থাকায় হামের মতো সংক্রামক রোগ থেকে তাদের রক্ষা করা খুবই কঠিন কাজ। হামের পাশাপাশি এসব শিশুর স্ক্যাবিস বা চুলকানিসহ অন্যান্য অসুখও আছে।
নিবাসের জনবল সংকট প্রকট, তারপরও তাদের বাঁচানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। মারা গেলে নিয়ম অনুযায়ী পরিবার বা দাবিদার না থাকলে বেওয়ারিশ হিসেবেই দাফন করতে হচ্ছে।
