‘ভারতের সাথে দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি’ বয়ান সৃষ্টি করা মানুষগুলো কেন ‘মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি’ নিয়ে নীরব?


‘ভারতের সাথে দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি’ বয়ান সৃষ্টি করা মানুষগুলো কেন ‘মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি’ নিয়ে নীরব?
বাংলাদেশ যখন গত এক মাসের বেশি সময় ধরে ভয়াবহ গ্যাস সংকটে ধুঁকছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো জ্বালানির অভাবে বসে আছে আর রেকর্ড লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত, তখন একটি প্রশ্ন সামনে চলে আসছে সঙ্গত কারণেই—সরকার সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও দ্রুত সরবরাহযোগ্য উৎস বাদ দিয়ে কেন তুলনামূলক ব্যয়বহুল ও দূরবর্তী উৎস থেকে গ্যাস আমদানিতে জোর দিচ্ছে? দামের হিসাব যা প্রশ্ন তোলে সরকারি অনুমোদিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কাতার এনার্জি ট্রেডিংয়ের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ১৫ বছর মেয়াদি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম নির্ধারিত হয়েছিল প্রায় ১০ দশমিক ০৭ থেকে ১০ দশমিক ১১৪ ডলার—অর্থাৎ একটি স্থিতিশীল, পূর্বনির্ধারিত ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্য। অথচ এই চুক্তির অধীনে এলএনজি গ্যাস না এনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে ডা ইউনূস এর বন্ধু পিটার হাসের এক্সিলারেট এনার্জি কেনা প্রতি এমএমবিটিইউর দাম দাঁড়িয়েছিল ১৩ দশমিক ৬৫ ডলার পর্যন্ত—যা কাতারের মূল্যের চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশের বেশি। সেই ড ইউনূসের করে যাওয়া ‘মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি’র বাধ্যবাধকতায় সাম্প্রতিক সময়ে অনুমোদিত আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি (১২ বছর, ১১৭ কার্গো) মার্কিন চুক্তিতে যদিও দাম নির্ধারিত হয়েছে আন্তর্জাতিক জেকেএম সূচকের সঙ্গে যুক্ত করে, তবু দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল-মূল্যের কাতার চুক্তির তুলনায় বাজারনির্ভর এই মূল্য কাঠামো সরকারকে মূল্যের অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়—বিশেষত এমন এক সময়ে, যখন বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম অস্থিতিশীল। প্রশ্ন হলো, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে তুলনামূলক কম ও স্থিতিশীল দামে এলএনজি পাওয়ার সুযোগ রয়েছে, সেখানে কেন সরকার একের পর এক নতুন চুক্তি ও জরুরি স্পট ক্রয়ের মাধ্যমে মার্কিন এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে চলেছে? সময়ের হিসাবও মেলে না গ্যাস সংকট মোকাবেলার জরুরি প্রয়োজনের সময়ও এই নির্ভরতা কোনো কাজে আসছে না। যুক্তরাষ্ট্র থেকে জাহাজে করে এলএনজি বাংলাদেশে পৌঁছাতে সাধারণত ৩০ থেকে ৩৫ দিন সময় লাগে—আটলান্টিক পেরিয়ে, আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত বা সুয়েজ খাল হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় জাহাজগুলোকে। অথচ মধ্যপ্রাচ্যের কাতার থেকে এই দূরত্ব ও সময় অনেক কম। ফলে যখন দেশে তাৎক্ষণিক সংকট দেখা দেয়, তখন সুদূর আমেরিকা থেকে আসা কার্গো বাস্তবে কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে পারে না—উল্টো দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর আরও দীর্ঘায়িত করে। পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, আগস্ট মাসের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ১ কার্গো, স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় ৫ কার্গো ও স্পট মার্কেট থেকে ৩ কার্গো এলএনজি কেনা হয়েছে। এর আগে গত জুলাই মাসে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তি এবং স্পট মার্কেটের মাধ্যমে মোট ১১ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হয়েছিল। এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ কোটি ৫২ লাখ এমএমবিটিইউ। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, কাতারভিত্তিক কাতার এনার্জি এবং ওমান সরকারের জ্বালানি ও পণ্য বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান ওকিউ ট্রেডিং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ করে থাকে। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ওকিউ ট্রেডিং স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে এলএনজি সরবরাহ করছে। কাতার তার মোট রপ্তানির প্রায় ৮০% এশিয়ায় পাঠায় (চীন, ভারত, পাকিস্তান, জাপান, দ. কোরিয়া, বাংলাদেশ), এবং যুদ্ধের সময়ও এই সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি—বরং আংশিক ব্যাহত হয়েছিল। সংকটকালে কাতার তার এশীয় ক্রেতাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি কিনে এশিয়ায় সরবরাহ করেছে বলেও জানা গেছে, যাতে সরবরাহে বিঘ্ন কম হয়। সার্বিকভাবে বলা যায়, কাতারের এলএনজি রপ্তানি এখন সচল, তবে যুদ্ধকালীন ক্ষতির প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ পূর্ণ-ক্ষমতায় ফিরতে আরও কিছু সময় লাগবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এশিয়ায় সরবরাহের সামগ্রিক চিত্র কাতার তার মোট রপ্তানির প্রায় ৮০% এশিয়ায় পাঠায় (চীন, ভারত, পাকিস্তান, জাপান, দ. কোরিয়া, বাংলাদেশ), এবং যুদ্ধের সময়ও এই সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি—বরং আংশিক ব্যাহত হয়েছিল। সংকটকালে কাতার তার এশীয় ক্রেতাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি কিনে এশিয়ায় সরবরাহ করেছে বলেও জানা গেছে, যাতে সরবরাহে বিঘ্ন কম হয়। সার্বিকভাবে বলা যায়, কাতারের এলএনজি রপ্তানি এখন সচল, তবে যুদ্ধকালীন ক্ষতির প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ পূর্ণ-ক্ষমতায় ফিরতে আরও কিছু সময় লাগবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। যে বয়ানে সরকার পতন হলো, সেই বয়ানের কী হলো? ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পটভূমিতে যেসব অভিযোগ ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছিল, তার একটি ছিল—ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী নানা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা দেশের সার্বভৌম স্বার্থ ক্ষুণ্ন করেছে। এই বয়ান তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনকে বৈধতা দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করেছিল। কিন্তু আজ প্রায় দুই বছর পার হয়ে গেলেও—ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থেকে শুরু করে বর্তমান বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার পর্যন্ত—নির্দিষ্ট করে এমন কোনো “দেশবিরোধী চুক্তি” জনসমক্ষে চিহ্নিত করে বাতিল করা হয়নি। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক: তাহলে কি এই অভিযোগ মূলত রাজনৈতিক আখ্যান তৈরির একটি হাতিয়ার ছিল, বাস্তব নীতিগত সংস্কারের লক্ষ্য নয়? মার্কিন চুক্তি নিয়ে নীরবতা কেন? এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য ও জ্বালানি সমঝোতাগুলো পর্যালোচনা করা হয়। এসব চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি বাধ্যবাধকতা মেনে নির্দিষ্ট পরিমাণ মার্কিন এলএনজি, গম, বোয়িং বিমান এবং বিভিন্ন প্রযুক্তি পণ্য কিনতে হচ্ছে—প্রায়ই বাজারের অন্য উৎসের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশি মূল্যে। অথচ এই ধরনের বাধ্যতামূলক ক্রয় চুক্তি নিয়ে যতটা রাজনৈতিক বা নাগরিক সমাজের প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন ছিল, ততটা প্রকাশ্য বিতর্ক বা জবাবদিহিতার দাবি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। যে তীব্রতায় ভারতের সঙ্গে করা চুক্তিগুলোকে “দেশবিরোধী” আখ্যা দেওয়া হয়েছিল, একই মানদণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাধ্যবাধকতামূলক ও তুলনামূলক ব্যয়বহুল চুক্তিগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে না কেন—এই ফারাকটিই এখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাভাবিক জিজ্ঞাসা এই সব তথ্য-উপাত্ত একসঙ্গে বিবেচনা করলে একটি স্বাভাবিক জিজ্ঞাসা তৈরি হয়: যারা ভারতের সঙ্গে করা চুক্তিকে “দেশবিরোধী” আখ্যা দিয়ে জনমত তৈরি করে ক্ষমতার পটপরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছিল, তাদের প্রকৃত অগ্রাধিকার কি ছিল বাংলাদেশের জ্বালানি-স্বার্থ সুরক্ষা, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ও বাধ্যবাধকতামূলক বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা? জ্বালানি সংকটের এই বাস্তবতা, ব্যয়বহুল ও ধীরগতির সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা, এবং “দেশবিরোধী চুক্তি” চিহ্নিত করে বাতিল করার ক্ষেত্রে দুই বছরের নীরবতা—এই সবকিছু মিলিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয় যে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের নেপথ্যে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের হিসাব-নিকাশ কতটা কাজ করেছিল। ---মৃণ্ময় সেন (আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক)

সর্বশেষ :

‘ভারতের সাথে দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি’ বয়ান সৃষ্টি করা মানুষগুলো কেন ‘মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি’ নিয়ে নীরব?   ‘ভারতের সাথে দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি’ বয়ান সৃষ্টি করা মানুষগুলো কেন ‘মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি’ নিয়ে নীরব? ‘শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ একান্তই ভারতীয় আদালতের বিষয়, ভারত সরকারের কিছু করার নেই’, অবস্থান স্পষ্ট দিল্লির   ‘শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ একান্তই ভারতীয় আদালতের বিষয়, ভারত সরকারের কিছু করার নেই’, অবস্থান স্পষ্ট দিল্লির বাদামতলী ঘাট: আওয়ামী লীগ আমলে ছিল সরকারি ফি ১০০ টাকা, এখন বিএনপি নেতাদের চাঁদা ২-৫ হাজার, নিচ্ছে পুলিশও   বাদামতলী ঘাট: আওয়ামী লীগ আমলে ছিল সরকারি ফি ১০০ টাকা, এখন বিএনপি নেতাদের চাঁদা ২-৫ হাজার, নিচ্ছে পুলিশও নিয়মিত কর্মকর্তাদের ওপর আস্থাহীনতা, আমলাতন্ত্র নিয়ন্ত্রণে চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তাদের ওপর ভরসা সরকারের   নিয়মিত কর্মকর্তাদের ওপর আস্থাহীনতা, আমলাতন্ত্র নিয়ন্ত্রণে চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তাদের ওপর ভরসা সরকারের বগুড়ার প্রথম জুলাই শহীদের মা ১৬ মামলার আসামি হেরোইন ও বিভিন্ন মাদকসহ গ্রেপ্তার   বগুড়ার প্রথম জুলাই শহীদের মা ১৬ মামলার আসামি হেরোইন ও বিভিন্ন মাদকসহ গ্রেপ্তার জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলার উন্নতিতে আরও সময় লাগবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী   জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলার উন্নতিতে আরও সময় লাগবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফুলবাড়ি কোল বেসিনে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন হবে সরকারের আরেকটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত   ফুলবাড়ি কোল বেসিনে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন হবে সরকারের আরেকটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হাটহাজারীতে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি বর্ষণ: আহত-১, এলাকায় চরম আতঙ্ক   হাটহাজারীতে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি বর্ষণ: আহত-১, এলাকায় চরম আতঙ্ক