হামের ভয়াবহ চিত্র (১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত):
মৃত্যু: ১,০০৮ জন (১০২টি ল্যাব-নিশ্চিত এবং ৯০৬টি সন্দেহভাজন)
আক্রান্ত: ১,৬৮,৩১০ জন সন্দেহভাজন (মার্চ থেকে হাসপাতালে ভর্তি ১,৪৮,১২০ জন)
ডেঙ্গুর ভয়াবহ চিত্র (১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত):*
মৃত্যু: ১৩৯ জন (গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু ৪ জন; ৮ সেপ্টেম্বর রেকর্ড ৯ জন মারা যান)
আক্রান্ত: ৪৮,৬১০ জন (গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি ১,৪৮০ জন; ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেপ্টেম্বরে মোট ভর্তি ৮,০৮৪ জন)
রোগের প্রকোপ প্রাকৃতিক হতে পারে, কিন্তু সেই রোগের কারণে দেশজুড়ে মৃত্যুমিছিল তৈরি হওয়া কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়—তা প্রশাসনিক অযোগ্যতা, চরম উদাসীনতা এবং নিদারুণ গাফিলতির সরাসরি ফসল। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ বাংলাদেশে হাম ও ডেঙ্গুর যে যুগপৎ সংহারী রূপ সামনে এসেছে, তা স্বাস্থ্য প্রশাসনের দায়িত্বহীনতা ও অন্তঃসারশূন্যতাকে উলঙ্গ করে দিয়েছে। হাসপাতালের মেঝেতে যখন মুমূর্ষু শিশু কাতরায়, আর শয্যা না পেয়ে চিকিৎসার অভাবে নাগরিক মারা যায়, তখন স্পষ্ট বোঝা যায়—জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা রক্ষায় রাষ্ট্র আজ চরমভাবে ব্যর্থ।
প্রতিরোধযোগ্য রোগে হাজার মৃত্যুর মিছিল-টিকাদান শৃঙ্খলার ধসঃ
যে হাম বিংশ শতাব্দীতেই টিকাদানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে এসেছে, ২০২৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর নাগাদ সেই প্রতিরোধযোগ্য রোগে ১,৬৮,৩১০ জন আক্রান্ত হওয়া এবং ১,০০০ ছাড়িয়ে মোট ১,০০৮ জন শিশুর প্রাণহানি কোনো সাধারণ ব্যর্থতা নয়—এটি প্রশাসনিক অবহেলার এক চরম দৃষ্টান্ত।
টিকার মান নিয়ে প্রশ্ন ও কাগুজে সাফল্য:
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬% বেশি টিকাদানের কাগুজে সাফল্য দেখালেও বাস্তবে শিশুমৃত্যুর গ্রাফ কমেনি। বিশেষজ্ঞরা বারবার রক্ত পরীক্ষা করে অ্যান্টিবডি (Serosurvey) ও ‘কোল্ড চেইন’ (Cold Chain)-এর মান যাচাইয়ের পরামর্শ দিলেও সরকার তাতে কান দেয়নি।
দায়িত্বহীনতা ও সদিচ্ছার অভাব:
টিকার গুণগত মান পরীক্ষা না করে কেবল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ভুয়া পরিসংখ্যান নিয়ে গর্ব করা সরকারের চরম নীতিগত দেউলিয়াত্বকে স্পষ্ট করে। ১ লাখ ৬৮ হাজারের বেশি শিশু আক্রান্ত হওয়ার পরও এ ধরনের দায়সারা মনোভাব প্রতিদিন নিষ্পাপ শিশুদের প্রাণ কেড়েই চলেছে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা- ফটোশুট আর কৃত্রিম ধোঁয়ার মহোৎসবঃ
আগস্টেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ২০,৫৩৬ জন। সেপ্টেম্বরের প্রথম ১০ দিনেই সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮,০৮ ৪ জনে, আক্রান্ত মোট ৪৮,৬১০ পার করেছে এবং মৃত্যু বেড়ে হয়েছে ১৩৯ জন। ৮ সেপ্টেম্বর এক দিনেই রেকর্ড ৯ জন মারা যান।
দায়বদ্ধতার অভাব:
প্রতিবেশী বা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যখন আধুনিক প্রযুক্তির ভেক্টর-কন্ট্রোল ব্যবহার করে ডেঙ্গু পরাস্ত করছে, তখন বাংলাদেশে সিটি কর্পোরেশন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাজ কেবল ফটোশুট আর ফগার মেশিনের কৃত্রিম ধোঁয়ায় সীমাবদ্ধ।
কোটি কোটি টাকার মশক নিধন বাজেট কোথায় উবে গেল, লার্ভিসাইডের নামে কী ছিটানো হলো—তার কোনো হিসাব নেই। ফলে সেপ্টেম্বরের শুরুতেই প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছেন।
ধারণক্ষমতার বাইরে হাসপাতাল ও মানবিক সংকট-স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দেউলিয়াত্বঃ
হাসপাতালগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকার চিত্রই বলে দেয়, যেকোনো জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলার ন্যূনতম প্রস্তুতিও স্বাস্থ্য প্রশাসনের ছিল না। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে বেড-অকুপেন্সি সর্বোচ্চ ১০০% থাকা উচিত, সেখানে জেলা হাসপাতালগুলোতে গড় বেড-অকুপেন্সি দাঁড়িয়েছে ১৭৮% এবং মেডিকেল কলেজগুলোতে ১৬৪%।
একদিকে হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে রোগীরা মেঝেতে কাতরাচ্ছেন, অন্যদিকে মিটফোর্ড হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখা ১৬৮ বছরের পুরনো হরিজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না করেই উচ্ছেদের চক্রান্ত চালানো হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো সামলাতে ব্যর্থ সরকার এখন প্রান্তিক সেবা প্রদানকারীদের ওপরই অমানবিক নিপীড়ন চালাচ্ছে।
নির্মিত অবকাঠামো চালাতে বর্তমান সরকারের চরম ব্যর্থতাঃ
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে যেটুকু আধুনিক পরিকাঠামো ও বিস্তৃত নেটওয়ার্ক দৃশ্যমান, তার বড় অংশই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গড়ে তোলা। হাজার হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক, নতুন বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট, উপজেলা ও জেলা হাসপাতালে শয্যা বৃদ্ধি এবং আধুনিক সরঞ্জাম পৌঁছানোর যে সুবিশাল ভিত্তি তৈরি করা হয়েছিল—পরবর্তী সময়ে ক্ষমতায় আসা ইউনূস সরকার এবং বর্তমান বিএনপি সরকার তা সচল রাখতে ও কাজে লাগাতে পুরোপুরি অপদার্থ প্রমাণ হয়েছে।
অবকাঠামো আছে, তদারকি নেইঃ
আওয়ামী সরকারের তৈরি করে যাওয়া সুসজ্জিত ভবন ও হাসপাতালগুলো আজ স্রেফ তদারকি এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে কার্যকারিতা হারিয়েছে। তদারকির অভাব ও আমলাতান্ত্রিক অলসতার কারণে আধুনিক পরিকাঠামো আজ স্থবির।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা:
পূর্ববর্তী সরকারের যুগান্তকারী ‘কমিউনিটি ক্লিনিক’ ও প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থাগুলোকে রাজনৈতিক বিদ্বেষের কারণে সচল না রেখে অকার্যকর রাখা হয়েছে। সরকারের এই নোংরা রাজনৈতিক খেয়ালখুশির চূড়ান্ত মাশুল দিতে হচ্ছে দেশের সাধারণ রোগীকে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের স্বাস্থ্য খাতে সফলতা-অর্জনের অমলিন ইতিহাসঃ
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তায় দূরদর্শী ও টেকসই ভিত রচনা করেছিল—
কমিউনিটি ক্লিনিক ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি:
তৃণমূল মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক চিকিৎসা পৌঁছে দিতে ‘কমিউনিটি ক্লিনিক’ মডেল প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা জাতিসংঘে ‘দ্য শেখ হাসিনা ইনিশিয়েটিভ’ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে অনন্য স্বীকৃতি লাভ করে।
টিকাদান ও রোগ নির্মূল:
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (EPI) সফল বাস্তবায়নে পোলিও মুক্ত বাংলাদেশ গঠন, ধনুষ্টংকার নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য ৮০% কোটা বাস্তবায়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও প্রশংসা অর্জিত হয়েছিল।
অবকাঠামোর আমূল পরিবর্তন:
সারাদেশে বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ, উপজেলা লেভেলে শয্যা সংখ্যা দ্বিগুণ করা এবং আধুনিক ডায়াগনস্টিক যন্ত্রপাতি পৌঁছে দিয়ে সার্বিক চিকিৎসা অবকাঠামোর আমূল উন্নয়ন করা হয়েছিল।
সংকট তৈরি করে তার পেছনে ছোটা-এটাই কি সরকারের নীতি?:
বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূল দর্শন দাঁড়িয়েছে—
‘রোগ প্রতিরোধে কোনো ভূমিকা রাখব না, মানুষ মারা গেলে দায়সারা বিবৃতি দেব’।
১. সময়মতো মানসম্মত ভ্যাকসিন পৌঁছে দেওয়ার এবং সেটির সঠিক কার্যকারিতা যাচাইয়ের ন্যূনতম দায়িত্বটুকু পালন করা হয়নি।
২. মশার প্রজনন রুখতে মৌসুম শুরুর আগে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
৩. তৈরি অবকাঠামো ও বিশ্বমানের চিকিৎসাব্যবস্থা হাতে পাওয়ার পরও তা পরিচালনা করতে না পারা বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর তীব্র প্রশাসনিক অক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ।
জনগণের করের টাকায় চলা সরকারের প্রধান সাংবিধানিক অঙ্গীকার নাগরিকের স্বাস্থ্য ও জীবনের নিরাপত্তা বিধান করা। ব্যর্থতার পর মহামারির দায় ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগের’ ওপর চাপিয়ে পার পাওয়ার দিন শেষ। তৈরি অবকাঠামো সচল না রেখে নাগরিকদের এই মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার চূড়ান্ত দায় বর্তমান সরকারকেই নিতে হবে।
রৌদ্র রুদ্র, (রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক)