দুর্ভিক্ষের সকল লক্ষণ দৃশ্যমান কৃষি ও উৎপাদন ব্যবস্থায়: তবে কি সেদিকেই এগোচ্ছে বাংলাদেশ?
প্রধান সম্পাদক
দেশের সার উৎপাদন ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ার মুখে। গ্যাস ও কাঁচামাল সংকটে দেশের ছয়টি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে পাঁচটিই এখন বন্ধ। একই সময়ে মাঠপর্যায়ে কৃষক সরকার নির্ধারিত দামে সার পাচ্ছেন না—আমন মৌসুমের ভরা সময়ে বস্তাপ্রতি বাড়তি গুনতে হচ্ছে ছয়শ টাকা পর্যন্ত। উৎপাদন সংকট আর বাজার সংকট একসঙ্গে মিলে যে চিত্র তৈরি হয়েছে, তাতে প্রশ্ন উঠছে—খাদ্য নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সব উপকরণের এই সম্মিলিত ঘাটতি কি বাংলাদেশকে বড় ধরনের কৃষি সংকট বা দুর্ভিক্ষসদৃশ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে?
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীনে থাকা পাঁচটি সরকারি ইউরিয়া কারখানা—ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার, শাহজালাল ফার্টিলাইজার, চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার (সিইউএফএল), যমুনা ফার্টিলাইজার এবং আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি—এর মধ্যে বর্তমানে কেবল শাহজালাল ফার্টিলাইজারই চালু আছে। বেসরকারিভাবে পরিচালিত কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানিও (কাফকো) গ্যাস সংকটে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। অর্থাৎ দেশের ছয়টি সার কারখানার পাঁচটিই এখন অচল। বিসিআইসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাঁচটি সরকারি কারখানার সম্মিলিত দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা প্রায় সাত হাজার একশ টন, আর পূর্ণ সক্ষমতায় সেগুলো চালাতে প্রতিদিন প্রায় ১৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন—যা এখন সরবরাহ করা যাচ্ছে না।
এই সংকট নতুন নয়, বরং ক্রমাগত ঘনীভূত হচ্ছে। আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার কারখানা প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ থাকায় রাষ্ট্র প্রতিদিন কোটি টাকার সার উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর আগে চট্টগ্রামের সিইউএফএল ও কাফকো অ্যামোনিয়া ও কাঁচামাল সংকটে বারবার বন্ধ হয়েছে। গ্যাস পাওয়ার পর কিছুদিনের জন্য ঘোড়াশাল-পলাশ কারখানা চালু হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আসেনি। ফলে চাহিদার তুলনায় দেশীয় উৎপাদনের ঘাটতি ক্রমাগত বাড়ছে, আর সরকারকে বাধ্য হয়ে আমদানি-নির্ভরতা বাড়াতে হচ্ছে—যা ব্যয় ও সরবরাহ-শৃঙ্খল উভয় দিক থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ।
উৎপাদন সংকটের প্রভাব সরাসরি পড়ছে কৃষকের ওপর। সরকার নির্ধারিত দামে ইউরিয়ার বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা এবং ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকা হলেও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিযোগ আসছে, ডিলার বা খুচরা বিক্রেতারা এই দামে সার দিচ্ছেন না। কুড়িগ্রামের এক কৃষক জানিয়েছেন, কয়েক দোকান ঘুরে তাঁকে ইউরিয়া কিনতে হয়েছে বস্তাপ্রতি দেড় হাজার টাকায় এবং ডিএপি চৌদ্দশ টাকায়—অর্থাৎ নির্ধারিত দামের চেয়ে ইউরিয়াতে দেড়শ টাকা ও ডিএপিতে সাড়ে তিনশ টাকা বেশি। ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষকদের বস্তাপ্রতি দুইশ থেকে ছয়শ টাকা পর্যন্ত বাড়তি গুনতে হচ্ছে বলে খবরে উঠে এসেছে, আর জয়পুরহাটে ডিলার-খুচরা বিক্রেতাদের বাড়তি দাম হাঁকানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাজশাহীর তানোরের একজন কৃষক বলেছেন, ভর্তুকি বা সরকারি দামে কোথাও সার মিলছে না; দোকানে গেলে বলা হয় সার নেই, ফলে বাধ্য হয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা প্রায়ই দাবি করছেন সারের কোনো সংকট নেই এবং বাড়তি দামে বিক্রির জন্য জরিমানা-শাস্তির ব্যবস্থা আছে। আবার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বাড়তি দামের পেছনে একে “ষড়যন্ত্র” বলে আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা হলো—আমন মৌসুমের ভরা সময়ে, যখন সারের চাহিদা সর্বোচ্চ, তখনই কৃষক নির্ধারিত দামে ন্যায্য সরবরাহ পাচ্ছেন না।
এখানেই তৈরি হচ্ছে উদ্বেগজনক এক চক্র। একদিকে গ্যাস ও কাঁচামাল সংকটে দেশীয় উৎপাদন প্রায় স্থবির, অন্যদিকে বাজারে কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি করে সিন্ডিকেট বাড়তি মুনাফা তুলে নিচ্ছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে অভিযোগ উঠেছে। ফলাফল—কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, লোকসানের শঙ্কা বাড়ছে, আর সময়মতো সার না পেলে ফলনও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। কৃষি একটি সময়-সংবেদনশীল খাত; রোপণ ও পরিচর্যার নির্দিষ্ট সময়ে সার না পেলে তার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে না।
দুর্ভিক্ষ সাধারণত একটিমাত্র কারণে ঘটে না—উৎপাদন ঘাটতি, সরবরাহ-শৃঙ্খলে বিপর্যয়, বাজারে কৃত্রিম সংকট ও মূল্য কারসাজি, এবং প্রান্তিক কৃষকের ক্রয়ক্ষমতার সংকট—এই উপাদানগুলো একসঙ্গে জড়ো হলে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে এই উপাদানগুলোর প্রায় সবগুলোই একসঙ্গে উপস্থিত দেখা যাচ্ছে—জ্বালানি সংকটে উৎপাদন বন্ধ, কাঁচামালের অভাব, বাজারে সরকারি দামের অকার্যকারিতা এবং কৃষকের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া দাম। এখনই এটিকে দুর্ভিক্ষ বলার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, তবে যেসব পূর্বলক্ষণ ও কাঠামোগত দুর্বলতা একটি খাদ্য সংকটের পথ প্রশস্ত করে, তার প্রায় সবই বর্তমানে সক্রিয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পমেয়াদে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করে অন্তত সবচেয়ে জরুরি কারখানাগুলো সচল রাখা, বাজার তদারকি জোরদার করে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, এবং প্রয়োজনে দ্রুত আমদানির মাধ্যমে ঘাটতি পূরণ জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ পরিকল্পনায় কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনসংশ্লিষ্ট শিল্পকে অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা ছাড়া উপায় নেই। প্রশ্ন হলো—নীতিনির্ধারকরা এই সতর্কসংকেত কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন, নাকি সংকট আরও গভীর না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ পিছিয়েই যাবে।
