শোক পালনের অধিকারও নাগরিক অধিকার, কোনোভাবেই বাধা দিতে পারে না রাষ্ট্র
প্রধান সম্পাদক
১৭৭৬ সালের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে টমাস জেফারসন লিখেছিলেন, সব মানুষ কিছু অলঙ্ঘনীয় অধিকার নিয়ে জন্মায়—তার মধ্যে আছে “জীবন, স্বাধীনতা ও সুখের সন্ধান”। এর মাধ্যমে তিনি ক্ষমতার একটি সীমারেখা টেনে দিয়েছিলেন। এসব অধিকার শাসকেরা কাউকে দেন না, আবার কেড়েও নিতে পারেন না। মানুষ হওয়ার কারণেই প্রত্যেকের এসব অধিকার রয়েছে।
কথাগুলো মন দিয়ে পড়লে তার গভীরতা উপলব্ধি করা যায়। জীবনের অর্থ শুধু বেঁচে থাকা নয়; মর্যাদা নিয়ে বাঁচার স্বাধীনতাও এর অংশ। স্বাধীনতা মানে ভয় বা খামখেয়ালি বলপ্রয়োগ ছাড়া কথা বলা, সমবেত হওয়া এবং নিজের বিশ্বাস পালন করা। আর সুখের সন্ধানের ধারণাটি আরও সূক্ষ্ম। এটি আনন্দের নিশ্চয়তা দেয় না; বরং অর্থপূর্ণ জীবন গড়ার স্বাধীনতা রক্ষা করে—ভালোবাসা, আপনজনের সঙ্গে যুক্ত থাকা এবং আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের সম্মান করার স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতার অর্থ থাকলে শোক পালন করার অধিকারও তার অন্তর্ভুক্ত।
শোক হলো ভালোবাসার শেষ প্রকাশ। মানুষ যখন জানাজা বা শেষকৃত্যে একত্র হয়, তখন তারা শুধু বিদায় জানায় না। তারা স্বীকার করে, একজন মানুষের জীবন অর্থবহ ছিল; আর যারা তাঁকে চিনতেন, তাঁদের সঙ্গে সেই জীবনের বন্ধন এখনো রয়ে গেছে। প্রায় সব সমাজই এই সত্য বোঝে। বিদায়ের আচারগুলো মানবসমাজের প্রাচীনতম রীতির মধ্যে পড়ে। রাষ্ট্র এসব আচার ব্যাহত করলে, যেখানে তার হস্তক্ষেপ করার কথা নয়, সেখানেই নাক গলায়।
এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইন স্পষ্ট। সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার এবং মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদার সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ যে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদন করেছে, সেখানে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, বিশ্বাসের স্বাধীনতা, পারিবারিক জীবনের প্রতি সম্মান এবং ব্যক্তির স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা রয়েছে। চুক্তিটি যথেচ্ছ গ্রেপ্তার করাও নিষিদ্ধ করেছে। বাংলাদেশের সংবিধানেও শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার অধিকার এবং আইনের সমান সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। এসব অধিকারের কোনোটিতেই জানতে চাওয়া হয়নি, মৃত ব্যক্তি কোন দলের ছিলেন।
দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশে এখন সেই প্রশ্নই তোলা হচ্ছে।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটনকে শেষ বিদায় জানাতে জড়ো হওয়া শোকাহত মানুষের ওপর বিএনপির কর্মীরা হামলা চালান এবং তাঁদের আহত করেন। হামলাকারীদের ঠেকাতে পুলিশ ব্যর্থ হয়। পরে গ্রেপ্তার করা হয় শোক জানাতে আসা মানুষদেরই।
এর অর্থ, শোকাহত নাগরিকদেরই অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে, অথচ তাঁদের ওপর হামলাকারীরা কোনো শাস্তির মুখে পড়েননি। ন্যায়বিচারের এই উল্টো চিত্রের জবাব দিতে হবে।
এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের জানাজা ও স্মরণানুষ্ঠান বারবার বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এসব ঘটনায় বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির কর্মী-সমর্থকরা দায়ী ছিল। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরও এটা থামেনি; এখন এসব ঘটছে রাষ্ট্রের নাকের ডগাতেই।
গোপালগঞ্জেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হয়। ১৫ই আগস্ট ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়া মানুষদেরও বাধা দেওয়া হয়েছিল।
এমন প্রতিটি ঘটনার বিচার করতে হবে তার নিজস্ব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে। এই ঘটনাগুলোর প্যাটার্ন দেখলে ধারাবাহিকতাটা বোঝা যায়। একে কাকতালীয় কিংবা হুট করে প্রতিপক্ষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সরকারের আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগ, তার শাসনকাল বা নেতাদের বিষয়ে যার যে মতই থাকুক, জানাজা কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ নয়। এমন একটি অনুষ্ঠানে হামলা করা, তারপর শোকাহত মানুষদেরই শাস্তি দেওয়া—রাষ্ট্র যে অধিকার রক্ষা করতে বাধ্য, তা লঙ্ঘন করা।
দল-মত নির্বিশেষে সকল মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখাই পুলিশের কাজ; এমনকি যাদের রাজনীতি সরকারের অপছন্দ, তাঁদেরও।
শোকপ্রকাশ শুধু সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ছোট ছোট পারস্পরিক সৌজন্যবোধই একটি জাতিকে একাতবদ্ধ করে রাখে।
রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা একে অন্যের জানাজা বা শেষকৃত্যে হামলা করতে পারে না। এসব সংঘাত শত্রুতা বাড়িয়ে চলে এবং শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্নকে আরও দূরে ঠেলে দেয়। ভয় দেখিয়ে কিছুদিন হয়ত মানুষকে চুপ করিয়ে রাখা যায়; ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা সেই নীরবতাকে সম্মতি ভেবে ভুলও করতে পারেন। কিন্তু তা সাধারণত বেশিদিন থাকে না। মানুষ এসব মনে রাখে, তাদের এবং মৃত স্বজনদের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হয়েছে।
আজ যে ক্ষোভের বীজ বপন করা হচ্ছে, পরের প্রতিটি সরকারকেই তার ফল ভোগ করতে হবে।
সমাধান কঠিন নয়। সরকারকে নিরপেক্ষ তদন্তের নির্দেশ দিতে হবে, শুধু জানাজায় অংশ নেওয়ার কারণে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দিতে হবে এবং যে দলেরই হোক, যারা সহিংসতা করেছে তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। শোকাহত মানুষদের সুরক্ষা দেওয়াও পুলিশের দায়িত্ব—এ নির্দেশ পুলিশকে স্পষ্টভাবে দিতে হবে।
বিদেশে বাংলাদেশের বন্ধুরা প্রায়ই দেশের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রশংসা করেছেন। তাঁদের এখন স্পষ্ট করে বলা উচিত, সেই আকাঙ্ক্ষা ঝুঁকির মুখে।
মৃতদের এবং তাঁদের শোক জানাতে আসা মানুষদের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হয়, তা থেকেই বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের চরিত্র বোঝা যায়। মর্যাদার জন্য সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশের বিষয়টি অন্য অনেক দেশের চেয়ে ভালো বোঝার কথা। শোকাহত মানুষদের তাঁদের প্রিয়জনকে শান্তিতে দাফন করতে দিন।
