বিএনপির সন্ত্রাসীদের নিপীড়নের ভিডিও করায় তৌফিককে হত্যা করা হয়, জানান সহকর্মীরা
অনলাইন নিউজ ডেক্স
বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের অভাব মেটাতে ও জীবিকার তাগিদে গাইবান্ধা থেকে গাজীপুরে এসেছিলেন ২০ বছরের তরুণ তৌফিক হোসেন। আশা ছিল পোশাক কারখানায় কাজ করে সংসারের হাল ধরবেন। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা সেই স্বপ্ন গুঁড়িয়ে দিল। গাজীপুরে গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন চলাকালে শ্রমিকদের ওপর বিএনপির পেটোয়া বাহিনীর সহিংসতার দৃশ্য মোবাইল ফোনে ভিডিও করার ‘অপরাধে’ নির্মম পিটুনির শিকার হন তিনি, জানান তারই সহকর্মীরা।
অবশেষে ৩রা নভেম্বর, মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকার উত্তরার শিন শিন জাপান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় না ফেরার দেশে চলে যান তরুণ তৌফিক। মঙ্গলবার রাতে লাশ হয়ে নিজ গ্রামে ফেরেন তিনি।
নিহত তৌফিক গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া গ্রামের মৃত তবিবর রহমান তবি খাঁর ছেলে। তিনি গোবিন্দগঞ্জের ছয়ঘরিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০২৩ সালের এসএসসি ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় থেকে তিনি স্থানীয় ‘লায়লা স্টাইল গার্মেন্টসে’ চাকরি করতেন।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, গত ২রা নভেম্বর, সোমবার গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকায় অবস্থিত ‘নোমান টেরিটোরি লিমিটেড’-এর সামনে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শত শত গার্মেন্টস শ্রমিক জমায়েত হয়ে আন্দোলন করছিলেন। একপর্যায়ে ওই পথ দিয়ে যাওয়া এক রিকশাচালক হঠাৎ ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিলে সেখানে উপস্থিত বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে ঘিরে ধরে মারধর শুরু করেন।
ঘটনাস্থলে থাকা তরুণ তৌফিক তার মোবাইল ফোনে এই মারধরের দৃশ্যটি ধারণ করতে যান। বিএনপি নেতাকর্মীরা বিষয়টি দেখতে পেয়ে ‘কেন ভিডিও করছিস?’ বলে তৌফিকের ওপর চড়াও হয় এবং তাকে ঘিরে ধরে বেধড়ক পিটিয়ে গুরুতর জখম করে।
মাথায় মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত তৌফিককে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) ভর্তি করা হয়। সেখানে দীর্ঘ সময় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকার পর মঙ্গলবার সকালে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
গতকাল মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে তৌফিকের লাশ তার গ্রামের বাড়ি ছয়ঘরিয়ায় এসে পৌঁছালে স্বজন ও গ্রামবাসীদের মাঝে কান্নার রোল পড়ে যায়।
তৌফিকের বড় ভাই হারুন মিয়া ও চাচা বাচ্চু মিয়া বলেন, “বাবার মৃত্যুর পর অভাবের সংসার চালাতে গাজীপুরে গিয়েছিল তৌফিক। আন্দোলনের সময় ভিডিও করতে গিয়ে এই নৃসংশ হামলার শিকার হতে হলো তাকে।”
তৌফিকের স্কুলশিক্ষক প্রদীব কুমারসহ সহপাঠীরা এ হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহফুজ আলম জানান, মঙ্গলবার রাতে তৌফিকের মরদেহ গ্রামে পৌঁছায় এবং বুধবার সকালে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়।
কোচাশহর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. জহুরুল হক জানান, তৌফিকের আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো ইউনিয়নে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
অন্যদিকে, ঘটনার বিষয়ে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, “কারখানা বন্ধ করা নিয়ে বহিরাগতদের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষের সময় একজন শ্রমিক গুরুতর আহত হয়ে পরবর্তীতে মারা গেছেন বলে জেনেছি। তবে ঘটনার সময় সেখানে পুলিশের কোনো সদস্য উপস্থিত ছিলেন না।”
এক তরুণ পোশাক শ্রমিকের এই নির্মম ও করুণ পরিণতি স্থানীয়দের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। সচেতন মহল অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছে।
এদিকে বিএনপির নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে এ ঘটনা ধামাচাপার চেষ্টায় অপপ্রচার চালাতে দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফরমে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের অনেককেই এ ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে আওয়ামী লীগের ওপর দায় চাপাতে দেখা গেছে।
