রহস্যে ঘেরা নিকরা বিল: নবাবগঞ্জে নিখোঁজের ৭ দিন পর ধানখেতে মিলল কাঠমিস্ত্রির লাশ
অনলাইন নিউজ ডেক্স
ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে ফিরেছিলেন কাঠমিস্ত্রি নারায়ণ সরকার (৫০)। কিন্তু সেই আনন্দ যে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে এক নির্মম ট্র্যাজেডিতে রূপ নেবে, তা কল্পনাও করতে পারেনি তাঁর পরিবার।
নিখোঁজ হওয়ার দীর্ঘ সাত দিন পর আজ বৃহস্পতিবার (৪ঠা জুন) সকালে ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার বক্সনগর ইউনিয়নের নিকরা বিলের একটি ধানখেত থেকে তাঁর ভাসমান লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
নিহত নারায়ণ সরকার বক্সনগর চৌরাহাঁটি এলাকার বাসিন্দা এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৭শে মে ঈদের ছুটিতে ঢাকা থেকে বাড়িতে আসেন নারায়ণ। পরদিন (২৮ মে) সকালে চাচাতো ভাই জগদীশ সরকার এবং প্রতিবেশী নিতাই ও পরাণ শীলকে সাথে নিয়ে বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে নিকরা বিলে যান তিনি। দুপুরে বাকিরা নিরাপদে বাড়ি ফিরে এলেও নারায়ণ সরকার আর ফেরেননি।
নিহতের চাচাতো ভাই বিনয় সরকার জানান, মাছ ধরতে যাওয়ার সময় বিলের লিজগ্রহীতা নিখিল রাজবংশীর সঙ্গে নারায়ণের তীব্র বাগ্বিতণ্ডা হয়েছিল। এই ঘটনার জের ধরেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্বজনেরা।
স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর চারদিন ধরে কোনো খোঁজ না পেয়ে নবাবগঞ্জ থানায় প্রথমে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। পরবর্তীতে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন নারায়ণের স্ত্রী চম্পা রানী। সেই মামলার সূত্র ধরে পুলিশ জগদীশ সরকার ও নিখিল রাজবংশীকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়।
অবশেষে আজ ৪ঠা জুন, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে এলাকাবাসী বিলের ধানখেতে একটি লাশ ভাসতে দেখে পুলিশে খবর দেয়। দুপুরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে গলিত লাশটি উদ্ধার করে সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
নবাবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু হানিফ জানান, “প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এটি একটি হত্যাকাণ্ড। হত্যার পর লাশটি আড়াল করতে বিলে ফেলে রাখা হয়েছিল। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলেই মৃত্যুর আসল কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। অপহরণ মামলার সূত্র ধরে আমাদের তদন্ত জোরালোভাবে চলছে।”
এদিকে নারায়ণের মৃত্যুর খবরে বক্সনগর চৌরাহাঁটি এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। বাড়ির উঠানে বসে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন স্ত্রী চম্পা রানী। বাবার অকাল মৃত্যুতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে তাঁর দুই মেয়ে বৈশাখী ও ঐশী।
দশম শ্রেণির ছাত্রী ছোট মেয়ে ঐশী সরকারের আহাজারিতে উপস্থিত প্রতিবেশীদের চোখেও জল আটকে রাখা দায় হয়ে পড়েছে। কাঁদতে কাঁদতে ঐশী বলে, “বাবা, তোমাকে কারা মেরে ফেলল? এখন আমাদের কে বাঁচাবে, কে খাওয়াবে? আমাদের লেখাপড়ার খরচই বা কে দেবে?”
পরিবারের একমাত্র চালিকাশক্তিকে হারিয়ে এখন এক অন্ধকার ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অসহায় এই পরিবারটি। তাঁদের এখন একটাই দাবি—সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল হোতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।
