‘পিংক বাস’ নামে নতুন যাত্রা
অনলাইন নিউজ ডেক্স
গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা, স্বস্তি এবং কর্মজীবী ও শিক্ষার্থীদের নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে প্রায় তিন দশক আগে শুরু হয়েছিল বিশেষ নারী বাসসেবা। ১৯৯৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে যোগাযোগমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর উদ্যোগে শুরু হওয়া সেই ‘মহিলা বাস’ নানা উদ্যোগ, বন্ধ হয়ে যাওয়া ও পুনরুজ্জীবনের পথ পেরিয়ে এবার ‘পিংক বাস’ নামে নতুন যাত্রা শুরু করেছে।
মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট বিআরটিসি নারীদের জন্য নতুন আঙ্গিকে এই বিশেষ বাসসেবা চালু করেছে। এবারের উদ্যোগে শুধু বাসের আলাদা রং নয়, পরিচালন ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। নারী যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত এই বাসসেবায় নারী চালক ও নারী কন্ডাক্টর রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিন দশকের নানা উদ্যোগ
বাংলাদেশে নারীদের জন্য পৃথক বাস সেবার প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৭ সালে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর উদ্যোগে কর্মজীবী নারী এবং স্কুল-কলেজের ছাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য বিআরটিসি পৃথক মহিলা বাসসেবা চালু করে।
এরপর ১৯৯৮ সালের শেষভাগে বা ১৯৯৯ সালে তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের যাতায়াত সহজ করতে আরও একটি বিশেষ বাসসেবা চালুর পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতিতে এসব উদ্যোগ স্থায়ী হয়নি।
২০০১ সালের নির্বাচনের পর নতুন সরকার প্রথম ১০০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচির অংশ হিসেবে নারীদের যাতায়াতের সমস্যা কমাতে আবারও উদ্যোগ নেয়। বন্ধ হয়ে যাওয়া মহিলা বাসসেবাকে নতুনভাবে সাজিয়ে ২০০২ সালের শুরুতে ঢাকা ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ রুটে সরকারি অর্থায়নে বড় পরিসরে চালু করা হয়।
প্রথম দুই-তিন বছর সেবাটি ভালোভাবে চললেও পরে লিজ নেওয়া বাসগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকিতে দুর্বলতা দেখা দেয়। ২০০৪ সালের আগস্টে ২২টি বাস দিয়ে নতুন করে রুট সাজানো হলেও পরে বাসের সংখ্যা কমতে কমতে ১১টিতে নেমে আসে। একপর্যায়ে সেবাটি প্রায় পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে যায়।
বারবার ফিরেও টেকেনি
২০০৮ সালের জুলাইয়ে মিরপুর-গুলিস্তান এবং খিলগাঁও তালতলা-গুলিস্তান রুটে পাঁচটি বাস দিয়ে বিশেষ নারী বাসসেবা আবার চালু করে বিআরটিসি। ২০০৯ সালের পর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সেবাটি পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করা হয় এবং ২০১৫ সাল নাগাদ সচল বাসের সংখ্যা ১২টিতে উন্নীত হয়।
তবে এরপরও সেবাটি কাঙ্ক্ষিত স্থায়িত্ব পায়নি। ২০২৪ সালের শুরুতে বাসের সংখ্যা কমে সাত থেকে নয়টিতে দাঁড়ায়। পর্যাপ্ত প্রচারণার অভাবে অনেক নারী যাত্রী এসব বাসের রুট ও সময়সূচি জানতেন না। ফলে অনেক সময় বাসগুলো যাত্রীস্বল্পতায় চলত এবং কোথাও কোথাও পুরুষ যাত্রী তুলে সেগুলোকে সাধারণ বাসের মতো ব্যবহার করা হতো।
সরকারি উদ্যোগের বাইরে বেসরকারি পর্যায়েও নারী যাত্রীদের জন্য পৃথক বাসসেবা চালুর চেষ্টা হয়েছে। ২০১৮ সালে র্যাংগস গ্রুপ ঢাকায় ‘দোলনচাঁপা’ নামে নারীদের জন্য আলাদা বাসসেবা চালু করে। এটি দেশে প্রথম বেসরকারি মহিলা বাসসেবা হিসেবে পরিচিতি পায়। র্যাংগস গ্রুপের মালিকের মেয়ে সোহানা চৌধুরী ছিলেন এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্যোক্তা।
৩৬ আসনের এসব বাস ছিল আইচার কোম্পানির তৈরি। বাসে সিসিটিভি ক্যামেরা, ফার্স্ট এইড বক্স এবং প্রতিবন্ধী যাত্রীদের ওঠার প্রয়োজনীয় সুবিধা রাখা হয়েছিল। তবে বেসরকারি এই উদ্যোগও শেষ পর্যন্ত টেকসই হয়নি।
এবার ‘পিংক বাস’
আগের উদ্যোগগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার নতুন আঙ্গিকে বিশেষ নারী বাসসেবা চালু করেছে বিআরটিসি। ১৮ আগস্ট চালু হওয়া এই সেবায় মোট ১৪টি গোলাপি রঙের দোতলা বাস যুক্ত হয়েছে।
এর মধ্যে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন রুটে ১০টি, বগুড়ায় দুটি এবং চট্টগ্রামে দুটি বাস চলবে। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের রুটগুলোর মধ্যে রয়েছে নতুন বাজার-মতিঝিল, তালতলা-মতিঝিল, ডেমরা-জিপিও, মিরপুর-মতিঝিল, মোহাম্মদপুর-মতিঝিল, আব্দুল্লাহপুর-মতিঝিল, গাজীপুর-বিমানবন্দর এবং নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা।
বগুড়ায় শেরপুর-মাটিডালি এবং চট্টগ্রামে কালুরঘাট-পতেঙ্গা রুটে চলবে বিশেষ এই বাস।
এবারের উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক নারী চালক ও নারী কন্ডাক্টর। বিশেষ এই সেবার জন্য প্রাথমিকভাবে প্রায় ১৬ জন নারী চালককে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে।
কতটা টেকসই হবে নতুন উদ্যোগ?
প্রায় তিন দশকের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নারীদের জন্য আলাদা বাস চালু করাই যথেষ্ট নয়। পর্যাপ্ত বাস, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, নির্ধারিত সময়সূচি, কার্যকর প্রচারণা, রুট ব্যবস্থাপনা এবং কঠোর তদারকির অভাবে আগের উদ্যোগগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
লিজ ব্যবস্থার পরিবর্তে কার্যকর সরকারি ব্যবস্থাপনা এবং নারী চালক-কন্ডাক্টর নিয়োগ এবারের উদ্যোগকে আগেরগুলোর তুলনায় আলাদা করেছে। তবে নতুন সেবার সাফল্য নির্ভর করবে এটি কতটা নিয়মিত, নির্ভরযোগ্য ও দীর্ঘস্থায়ীভাবে পরিচালনা করা যায় তার ওপর।
নারীদের কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি গণপরিবহনে হয়রানি, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ ও নিরাপত্তাহীনতা কমানোর লক্ষ্যেই ‘পিংক বাস’ চালু করা হয়েছে। প্রায় তিন দশক আগে শুরু হওয়া ‘মহিলা বাস’ এবার নতুন নামে কতটা সফল হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
