মাত্র এক দশকেই এলএনজি রপ্তানিকারক সব দেশকে ছাড়িয়ে শীর্ষস্থানে যুক্তরাষ্ট্র
অনলাইন নিউজ ডেক্স
মাত্র এক দশকের ব্যবধানে বৈশ্বিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাজারে অভূতপূর্ব উত্থান ঘটিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৫ সালে যেখানে দেশটির এলএনজি রপ্তানি ছিল প্রায় শূন্যের কোটায়, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫.২ ট্রিলিয়ন ঘনফুটে।
এর মাধ্যমে কাতার ও অস্ট্রেলিয়াকে পেছনে ফেলে বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনার্জি ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ অব ওয়ার্ল্ড এনার্জি অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক এলএনজি রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে প্রায় ১.১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যা বৈশ্বিক সরবরাহ বৃদ্ধির প্রায় ৯৩ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি রপ্তানি ছিল ০.০৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুটেরও কম। সে সময় কাতার ছিল বিশ্বের শীর্ষ রপ্তানিকারক। তবে শেল গ্যাস বিপ্লব, উন্নত উত্তোলন প্রযুক্তি এবং উপসাগরীয় উপকূলে গড়ে ওঠা শক্তিশালী জ্বালানি অবকাঠামোর কারণে গত এক দশকে দেশটি উৎপাদন ও রপ্তানিতে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে।
বর্তমানে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারিত্ব বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫.৪ শতাংশে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্প ব্যয়ে শেল গ্যাস উত্তোলন, বিদ্যমান পাইপলাইন ও বন্দর অবকাঠামো এবং আমদানির জন্য নির্মিত টার্মিনালগুলোকে রপ্তানি কেন্দ্রে রূপান্তর করার কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের এই সাফল্যের মূল ভিত্তি।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি রপ্তানি বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে লুইজিয়ানার প্ল্যাকেমিনস এলএনজি এবং করপাস ক্রিস্টি স্টেজ-৩ প্রকল্প। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, শুধু প্ল্যাকেমিনস প্রকল্প থেকেই বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহ বৃদ্ধির ৬০ শতাংশের বেশি এসেছে।
এছাড়া নমনীয় রপ্তানি চুক্তির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারেও মার্কিন এলএনজির চাহিদা বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউরোপে দেশটির এলএনজি সরবরাহ দৈনিক গড়ে ১০.৩ বিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বছরজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট এলএনজি রপ্তানির প্রায় ৬৮ শতাংশই গেছে ইউরোপে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনও রেকর্ড দৈনিক ১০৩.৯ বিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছেছে। বর্তমানে বিশ্বের মোট প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
পারমিয়ান বেসিন, অ্যাপালাচিয়া এবং হেইনসভিল অঞ্চল দেশটির উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এলএনজির প্রসারের ফলে বৈশ্বিক গ্যাস বাণিজ্যের কাঠামোও বদলে যাচ্ছে। ২০২৫ সালে আন্তঃআঞ্চলিক এলএনজি বাণিজ্য বেড়েছে ৬.৫ শতাংশ, বিপরীতে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস বাণিজ্য কমেছে ৩.৬ শতাংশ। বর্তমানে আন্তঃআঞ্চলিক প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় ৫৫ শতাংশই এলএনজির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি প্রবৃদ্ধি আগামী বছরগুলোতেও অব্যাহত থাকবে। প্ল্যাকেমিনস ও করপাস ক্রিস্টি প্রকল্পের সম্প্রসারণের পাশাপাশি গোল্ডেন পাস, পোর্ট আর্থার ও রিও গ্র্যান্ডে এলএনজি প্রকল্প চালু হলে রপ্তানি আরও বাড়বে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি দশকের শেষ নাগাদ বিশ্বের মোট এলএনজি বাজারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ, দীর্ঘ সময় এবং পর্যাপ্ত পাইপলাইন অবকাঠামো প্রয়োজন। একই সঙ্গে রপ্তানি বাড়ার ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ গ্যাসের দামও বৈশ্বিক বাজারের ওঠানামার সঙ্গে আরও বেশি সংযুক্ত হয়ে পড়তে পারে।
