যশোরে দিনে ১৪ ঘণ্টা থাকছে না বিদ্যুৎ, খামারে মরছে হাজার হাজার মুরগি
অনলাইন নিউজ ডেক্স
যশোরের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় চরম বিপাকে পড়েছেন পোলট্রি খামারিরা। খামারিদের দাবি, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না। এমনকি টানা ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে কোনো কোনো এলাকায়। এতে গরমে খামারের মুরগি মারা যাচ্ছে। এরই মধ্যে এক খামারির প্রায় ২ হাজার মুরগি মারা যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
৯ই আগস্ট, রোববার খামারিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
খামারিদের ভাষ্য, গরমের মধ্যে খামারে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য ফ্যানসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চালু রাখতে হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় খামারে প্রচণ্ড গরম তৈরি হচ্ছে। এতে মুরগি হাঁসফাঁস করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে মারা যাচ্ছে।
অভয়নগরের নওয়াপাড়া পৌরসভার বুইকরা গ্রামের খামারি মো. হাসান ও মো. হোসেনের খামারে এমনই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দুই যমজ ভাইয়ের খামারে গত শুক্রবার পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সী প্রায় আড়াই হাজার মুরগি ছিল। এর মধ্যে প্রায় ৫০০টি মুরগি কয়েক দিনের মধ্যেই বিক্রির উপযোগী হওয়ার কথা ছিল।
হাসান জানান, শুক্রবার রাত ১২টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত টানা আট ঘণ্টা তাদের এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। এই সময়ের মধ্যে বিক্রির উপযোগী চার শতাধিক মুরগি মারা যায়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে হাসান বলেন, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেল। আমরা ধারদেনা করে দুই ভাই খামারটি করেছি। বাবা-মাকে নিয়ে সারাদিন দেখাশোনা করি। এবার মুরগি বিক্রির সময় হয়ে গেছে। ভেবেছিলাম বিক্রি করে সব দেনা পরিশোধ করব। কিন্তু বিদ্যুতের কারণে সব শেষ হয়ে গেল।’
তিনি জানান, মুরগির খাবার ও ওষুধের দোকানে বাকিসহ সব মিলিয়ে তাদের প্রায় সোয়া লাখ টাকা দেনা রয়েছে। মুরগি বিক্রি করে সেই দেনা পরিশোধের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু মুরগি মারা যাওয়ায় এখন কীভাবে ঋণ শোধ করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।
অন্য খামারিরাও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, কোনো কোনো দিন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না। আবার কখনও একটানা ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকে।
খামারি সজীব বলেন, বিদ্যুতের দীর্ঘস্থায়ী সংকটে তার খামারের প্রায় ২ হাজার মুরগি মারা গেছে। এতে তিনি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
খামারিদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ সরবরাহে দীর্ঘ বিরতির কারণে খামারে মুরগির স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে দিনের তীব্র গরমে বিদ্যুৎ না থাকলে ফ্যান ও ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। এতে অল্প সময়ের মধ্যেই খামারের ভেতরে তাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং মুরগির মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হয়।
পোলট্রি খামারিদের জন্য এমন ক্ষতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ মুরগি পালন করতে খাবার, ওষুধ, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খাতে নিয়মিত ব্যয় হয়। অনেক উদ্যোক্তাই ঋণ বা ধারদেনা করে খামার পরিচালনা করেন। মুরগি বিক্রির ঠিক আগে মারা গেলে একদিকে বিনিয়োগের অর্থ ফেরত আসে না, অন্যদিকে ঋণের বোঝাও থেকে যায়।
হাসান ও হোসেনের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাদের বাবা মোহাম্মদ আলী আগে দিনমজুরি করতেন। অর্থাভাবে সন্তানদের বেশি পড়াশোনা করাতে পারেননি। হাসান আকিজ ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে ডিপ্লোমা করেছেন। হোসেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে সম্মান তৃতীয় বর্ষ পর্যন্ত পড়েছেন। চাকরির জন্য অনেক চেষ্টা করেও সফল না হওয়ায় ২০২৩ সালে এনজিও থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তারা পোলট্রি খামার শুরু করেন।
বার্ষিক ৫০ হাজার টাকা ভাড়ায় ২৫ শতাংশ জমিতে গড়ে তোলা খামারটিতে পরিবারের সদস্যরাও শ্রম দেন। খামারটি চালুর পর তাদের পরিবারে কিছুটা সচ্ছলতা ফিরেছিল। কিন্তু বিদ্যুৎ সংকটের কারণে এখন সেই খামারই বড় লোকসানের মুখে পড়েছে।
এ বিষয়ে নওয়াপাড়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর ডিজিএম সনজিৎ কুমার মণ্ডল জানান, শুক্রবার রাতে উপজেলার সরখোলা গ্রামে বিদ্যুতের তারের ওপর নারিকেলগাছ পড়ে একটি তার ছিঁড়ে যায়। এতে ওই এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহে বিভ্রাট দেখা দেয়। রাতে ঘটনা ঘটায় তাৎক্ষণিকভাবে লাইনটি মেরামত করা সম্ভব হয়নি। শনিবার সকালে লাইনটি মেরামত করে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা হয়েছে।
তবে খামারিদের দাবি, এটি শুধু একটি দিনের সমস্যা নয়; নিয়মিত দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পোলট্রি খাতের উদ্যোক্তারা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তাদের আশঙ্কা, গরমের সময়ে এভাবে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকলে আরও বিপুলসংখ্যক মুরগি মারা যেতে পারে। এ অবস্থায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘ সময়ের বিদ্যুৎ বিভ্রাটের স্থায়ী সমাধান চান তারা।
