তুরাগ হত্যাকাণ্ড: বিএনপি ও পুলিশের অস্বীকারের পরেও সত্য উদ্ঘাটন; পুলিশ-বিএনপি’র যৌথ অভিযান ও হামলা!


তুরাগ হত্যাকাণ্ড: বিএনপি ও পুলিশের অস্বীকারের পরেও সত্য উদ্ঘাটন; পুলিশ-বিএনপি’র যৌথ অভিযান ও হামলা!
ঢাকার তুরাগ নদে গত ২২ জুন আওয়ামীলীগের মিছিলে পুলিশ ও স্থানীয় বিএনপি কর্মীদের অভিযান ও ধাওয়ার কারণে ৪ জন যুবলীগ ও ছাত্রলীগ কর্মী নদীতে ডুবে মারা গেছেন বলে যে অভিযোগ উঠেছিল, সেটা অবশেষে বিভিন্ন সংবাদপত্রের অনুসন্ধানী তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলো। হাজারো চেষ্টা করেও পুলিশ ও স্থানীয় বিএনপি সংশ্লিষ্টরা এই সত্য লুকিয়ে রাখতে পারেনি। প্রত্যক্ষদর্শী, পরিবার ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের তথ্যে ঘটনার বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে। ২২ জুন যা ঘটেছিল ২২ জুন দুপুরে ৫৩নং ওয়ার্ড যুবলীগের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষে ট্রলারে করে ফেরার পথে আশুলিয়া গরুর হাট সংলগ্ন ঘাটে নামার সময় ঘটনাটি ঘটে। প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জনকে বহনকারী নৌকা/ট্রলার ঘাটে ভিড়তেই পুলিশের পোশাক পরা ৮-৯ জন এবং সাদা পোশাকের আরও ৮-৯ জন (স্থানীয়দের অনেকে যাদের বিএনপি কর্মী বলে চিহ্নিত করেছেন) তাদের ধাওয়া করে। বিডিনিউজ২৪ কে এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান “পুলিশের সঙ্গে সাদা পোশাকে কিছু লোকজনও ছিল, যাদেরকে দেখে পুলিশ মনে হয়নি। রাজনৈতিক নেতাকর্মী বলে মনে হয়েছে। পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ৪ জন পোশাকে ও ৬-৭ জন ছিলেন পুলিশের কটি পরা। তবে পুলিশ মনে হয়নি এমন ছিলেন আরো আরো ১০-১২ জন।” প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়, পুলিশ ও সাদা পোশাকধারীদের দেখে আতঙ্কিত হয়ে অনেকে ট্রলার থেকে নদীতে লাফিয়ে পড়েন। ৭ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অনেকে সাঁতরে বা ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে পালিয়ে প্রাণ বাঁচান। স্থানীয়রা ৫-৬ জনকে নদী থেকে উদ্ধার করেন। পুলিশ বা সাদা পোশাকধারীরা কাউকে নদী থেকে উদ্ধারের চেষ্টা করেনি বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। দুই প্রত্যক্ষদর্শী জানান “ঘটনার দিনে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে ট্রলারে থাকা বেশিরভাগকেই নদীতে পড়ে যেতে দেখা গেছে, যাদের মধ্য থেকে ৬-৭ জনকে স্থানীয়রা নদী থেকে হাত দিয়ে টেনেও তুলেছেন। পরে পুলিশ আবার ধাওয়া দিলে তাদের সামনেই উদ্ধার হওয়া লোকগুলো আবার নদীতে ঝাঁপ দেয়।” পুলিশের অস্বীকৃতি, গ্রেফতারের হুমকি ও গুজব প্রচারের অভিযোগ ঘটনার পর থেকে ২৪ জুন পর্যন্ত পুলিশ এই অভিযান, গ্রেপ্তার বা নদীতে ঝাঁপ দেওয়া সংক্রান্ত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। ২৪ জুন থেকে তুরাগ নদ থেকে লাশ উদ্ধার শুরু হলে বিষয়টি সামনে আসে। ২৬ জুন থেকে বিডিডাইজেস্ট, আগামীর কণ্ঠসহ কয়েকটি সংবাদ মাধ্যম এই বিষয়ে প্রথম সংবাদ প্রকাশ করে দাবী করে তুরাগ নদ রক্তাক্ত হয়েছে আওয়ামীলীগ কর্মিদের রক্তে। তার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মী সমার্থকদের #তুরাগহত্যাকাণ্ড হ্যাশট্যাগে ছবি ও তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। ২৭ জুন পুলিশ প্রথমবার দাবি করে, এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। তারা শুধু ‘নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের মিছিল’ থেকে ৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। মেট্রোপলিটন পুলিশের সোশ্যাল মিডিয়ায় অপতথ্য ছড়ালে আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। পুলিশ সদরদপ্তর ২৭ জুন ‘সাতজনের মৃত্যু’র খবরকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে বিবৃতি দেয়। ২৮ জুন সংবাদ সম্মেলনে ঢাকার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন দাবি করেন, সাভার ও আশুলিয়ায় উদ্ধারকৃত লাশের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই। একইসঙ্গে ঢাকা-১৮ আসনের বিএনপি এমপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, তুরাগের ঘটনায় বিএনপি সম্পৃক্ত নয়; অভিযান পুলিশ পরিচালনা করেছে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও সত্য উন্মোচন এ ঘটনায় আওয়ামী লীগ কর্মী-সমর্থকদের তোলা ছবি, মিছিল ও শপথ গ্রহনের ভিডিও, তথ্য-উপাত্ত ও দাবির সঙ্গে পুলিশ ও বিএনপির বক্তব্যের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। চারটি লাশ উদ্ধারের পরও ধাঁধা রয়ে গেছিলো, এটি দুর্ঘটনা না হত্যাকান্ড? একইসঙ্গে এতোগুলা উদ্ধরকৃত লাশের পরিচিত সম্পর্কে রয়ে গেছিলো ধোঁয়াশা। নাগরিক সমাজের অনেকেই এটিকে আওয়ামীলীগের গুজব সেলের রচিত গল্প হিসাবে আখ্যায়িত করতে থাকে। ২৮ জুন দ্য ডেইলি স্টার সরেজমিন অনুসন্ধান করে প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে। ২৯ জুন বিডিনিউজ২৪ ঘটনাস্থল ঘুরে এসে ঘটনার সত্যতা প্রকাশ করে। ডুবে যাওয়াদের উদ্ধারে অনীহাঃ পুলিশের মানবাধিকার লংঘন স্থানীয়দের ভাষ্যে এটাও উঠে আসে যে, পুলিশে অভিযানে নদীতে লাফ দেয়া যুবলীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মিদের উদ্ধারে পুলিশের কোন চেষ্টাই লক্ষ্য করা যায় নাই। এটিকে সবচেয়ে আশংকাজনক ঘটনা হিসাবে ধারনা করা হচ্ছে, কারন নদীতে যারা লাফিয়ে পড়েছিল তাদের অনেকের অবস্থা দেখে স্থানীয়রা বিডিনিউজ২৪ এর সাংবাদিককে শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “কয়েকজন ডুবে গিয়েও থাকতে পারে ,কারণ তারা সাঁতার দিতে পারতাছিল না।” ডুবন্ত কর্মীদের উদ্ধারের কোন চেষ্টাই করেনি অভিযান চালানো পুলিশ ও সাথে থাকা বিএনপির নেতাকর্মীরা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী মানুষের জীবন রক্ষা করা রাষ্ট্রের একটি অন্যতম মৌলিক ও ইতিবাচক বাধ্যবাধকতা। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICCPR)-এর ধারা ৬(১) মানুষের জন্মগত বাঁচার অধিকারকে সুরক্ষিত করেছে, যার পরিধি কেবল রাষ্ট্র কর্তৃক জীবন কেড়ে না নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির ব্যাখ্যা (General Comment No. 36) অনুযায়ী, বিপন্ন মানুষের জীবন বাঁচাতে রাষ্ট্রকে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষ করে ঘটনাটি যদি নদী, সমুদ্র বা কোনো জলভাগে ঘটে, তবে UNCLOS (১৯৮২) এর ধারা ৯৮ এবং SAR কনভেনশন (১৯৭৯) এর বৈশ্বিক বাধ্যবাধকতা অনুসারে বিপন্ন বা ডুবন্ত ব্যক্তিকে উদ্ধার করা রাষ্ট্রের কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী বা জলপথ পুলিশের জন্য একটি আইনি ও বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। ফলে, নিরাপত্তা বাহিনীর কোনো সদস্যের উপস্থিতিতে চোখের সামনে ডুবতে থাকা কোনো ব্যক্তিকে উদ্ধারের চেষ্টা না করা বা জরুরি সেবা প্রদানে নিষ্ক্রিয়তা দেখানো এই আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সামুদ্রিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়। পুলিশের অভিযানে নদীতে লাফ দিয়ে গ্রেফতার এড়ানোর চেষ্টা করে ডুবে যাওয়া এই রাজনৈতিক নেতাকর্মিদের উদ্ধারে কেন পুলিশ কোন চেষ্টা করেনি সেটা মানবাধিকার আইনও অনুযায়ী বিচারের দাবী রাখে। নিহত ৪ জনের পরিচয় ঢাকার তুরাগ থানার রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা মো. সুমন ২২ জুন বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকে নিখোঁজ ছিলেন। শুক্রবার (২৬শে জুন) তুরাগ নদ থেকে তার অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে আশুলিয়া থানা পুলিশ। নিহত সুমনের পরিবারের উপর পুলিশি চাপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে — তাকে ‘পিকনিকে গিয়ে দুর্ঘটনায়’ মারা গেছে বলে এজহার লিখে সুমনের ভাইকে তাতে স্বাক্ষর করতে বলা হয়। ২৪ জুন সকালে দারুসসালাম থানাধীন তুরাগ নদ থেকে রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা আরিফ হাসান রাকিবেরও মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি ২২ জুন থেকে নিখোঁজ ছিলেন। আরিফ হাসান রাকিবের চাচা আসাদুল ইসলাম ডেইলি স্টারকে বলেন, এ বিষয়ে কথা বলতে চাই না। সে আওয়ামী লীগের মিছিল করতো শুনেছি। যা ঘটেছে ফেসবুকেই দেখেছেন। ছাড়া নিহত বাকি দুজন মারুফ হাসান ও রনি মোল্যার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি কোন সাংবাদিকের। যদিও পুলিশের দাবী, মারুফ হাসান ও রনি মোল্যা ২৬-২৭ তারিখে দিয়াবাড়ি এলাকায় তুরাগ নদে গোসল করতে গিয়ে নিখোঁজ ছিলেন। এছাড়ও ৫ম আরেকজন ব্যাক্তির লাশ তুরাগ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবী করা হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। দাবী অনুযায়ী ৫ম ব্যাক্তির নাম বিপ্লব, যিনি ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের একজন কর্মী। যদিও এই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয় নাই। নাগরিক সমাজের উদ্বেগের জায়গা পুলিশ বারবার আসল ঘটনা অস্বীকার করে, লাশ উদ্ধারের ঘটনা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে পরিবারগুলোকে চাপ দেয়া এবং নিহতদের পরিবারকে মুখ না খুলতে বলা — এটি নাগরিক সমাজে বড় আশঙ্কা তৈরি করেছে। অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, পুলিশ কি আদৌ সত্য বলছে? এমন আরও কতো ঘটনা তাহলে পুলিশ এভাবে ধামাচাপা দিয়েছে? রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রেস কনফারেন্স করে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার বিষয় নিয়েও সমালোচনা করেছেন রাজনৈতিক বোদ্ধারা। তুরাগ ঘটনা শুধু একটি স্থানীয় অভিযান নয়, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পুলিশি বলপ্রয়োগ, অভিযান ও গ্রেপ্তারের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। স্বাধীন, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ময়নাতদন্ত রিপোর্ট প্রকাশের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন না হলে নাগরিক আস্থা আরও ক্ষুণ্ণ হবে।

সর্বশেষ :

তুরাগ হত্যাকাণ্ড: বিএনপি ও পুলিশের অস্বীকারের পরেও সত্য উদ্ঘাটন; পুলিশ-বিএনপি’র যৌথ অভিযান ও হামলা!   তুরাগ হত্যাকাণ্ড: বিএনপি ও পুলিশের অস্বীকারের পরেও সত্য উদ্ঘাটন; পুলিশ-বিএনপি’র যৌথ অভিযান ও হামলা! ভেনিজুয়েলায় ভূমিকম্প: মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১,৭১৯, নিখোঁজ অর্ধলক্ষাধিক   ভেনিজুয়েলায় ভূমিকম্প: মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১,৭১৯, নিখোঁজ অর্ধলক্ষাধিক মার্তিনেল্লির গোলে  রোমাঞ্চকর জয়ে শেষ ষোলোতে ব্রাজিল   মার্তিনেল্লির গোলে রোমাঞ্চকর জয়ে শেষ ষোলোতে ব্রাজিল ‘সংসার চলে না, চিকিৎসা বন্ধ’— ব্যাংক একীভূতকরণের জাঁতাকলে পিষ্ট ৩ কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ   ‘সংসার চলে না, চিকিৎসা বন্ধ’— ব্যাংক একীভূতকরণের জাঁতাকলে পিষ্ট ৩ কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ পুরান ঢাকায় গণশৌচাগার দখল করে স্বেচ্ছাসেবক দলের কার্যালয়   পুরান ঢাকায় গণশৌচাগার দখল করে স্বেচ্ছাসেবক দলের কার্যালয় এডিপি বাস্তবায়নে ১৬ বছরের সর্বনিম্ন রেকর্ড: কর্মকর্তাদের সক্ষমতার অভাবে থমকে আছে প্রকল্প বাস্তবায়ন   এডিপি বাস্তবায়নে ১৬ বছরের সর্বনিম্ন রেকর্ড: কর্মকর্তাদের সক্ষমতার অভাবে থমকে আছে প্রকল্প বাস্তবায়ন কোথায় চলেছে দেশ: জ্বালানি সংকটে অচল ১৫টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র, কিছু চলছে রেশনিং করে   কোথায় চলেছে দেশ: জ্বালানি সংকটে অচল ১৫টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র, কিছু চলছে রেশনিং করে ডাকাতি মামলায় বিএনপির ৯ নেতাকর্মী কারাগারে   ডাকাতি মামলায় বিএনপির ৯ নেতাকর্মী কারাগারে