ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে হামলা, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের শঙ্কা বিশেষজ্ঞদের
অনলাইন নিউজ ডেক্স
তুরস্কের আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি “শেষ” বলে ঘোষণা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বিভিন্ন শহরে একাধিক বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা মেহর জানিয়েছে, নৌবাহিনীর ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত সিরিক ও বন্দর আব্বাসে বিস্ফোরণ শোনা গেছে এবং বন্দর আব্বাসে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে।
এছাড়া চাবাহার, বুশেহর ও আবু মুসা দ্বীপেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। চাবাহারে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং একটি হাসপাতালে হামলার আঘাত লাগার তথ্যও দিয়েছে ইরানি সংবাদমাধ্যম।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকম) নিশ্চিত করেছে যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে এই হামলা চালানো হয়েছে। তারা জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক নাবিকদের ওপর ইরানের “অযৌক্তিক আগ্রাসনের” জবাব দিতেই এই পদক্ষেপ।
এক মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, এবারের হামলা আগের দিনের চেয়ে বড় এবং ব্যাপ্তিতে বিস্তৃত হবে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদক জানান, হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে ইরানের রেভ্যুলুশনারি গার্ডের উপকূলীয় রাডার, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র অবস্থান ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
এর আগে ন্যাটো সম্মেলনে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির পাশে বসে ট্রাম্প বলেছিলেন, “এটি হয়তো বড় ধরনের হামলা হবে এবং অনেক কিছু ধ্বংস করে দেবে… আমরা আজ রাতে কঠোরভাবে আঘাত হানতে যাচ্ছি।”
তবে তিনি জানান, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা লবণাক্তমুক্তকরণ কেন্দ্রের মতো স্থাপনাগুলোতে “প্রয়োজন না পড়লে” আঘাত করা হবে না।
তিনি ইরানকে “নোংরা” ও “অসুস্থ মানুষদের দ্বারা পরিচালিত” বলেও মন্তব্য করেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়েদ আব্বাস আরাগচি হামলার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, তার দেশ “কাজ দিয়েই জবাব দেবে— নির্ভীকভাবে এবং সাহসের সঙ্গে।”
ইরানের রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম নূরনিউজ জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে “ব্যাপক” হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। তবে বুশেহরে হামলায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কোনো ক্ষতি হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
এদিকে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জেনিফার পার্কার বলেন, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে, যদিও তা মার্চ-এপ্রিলের মতো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের রূপ নেবে না বলে মনে করেন তিনি।
তার ভাষায়, এটি হবে বিরতির পর টিট-ফর-ট্যাট প্রতিশোধ, হরমুজ প্রণালীতে মাঝেমধ্যে হামলা এবং পুনরায় আলোচনার এক চক্র।
তিনি জানান, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল আগের তুলনায় (দৈনিক ১৩০টির বদলে) অনেক কমে গেছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে।
পার্কারের মতে, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণকেই ইরান তার মূল কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে দেখে, আর এটিই দুই দেশের মধ্যে ভবিষ্যৎ আলোচনায় প্রধান জটিলতা হয়ে দাঁড়াবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করে বলেন, ইরানের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করা যুক্তরাষ্ট্রকে শক্তিশালী করবে না, বরং আরও প্রাণহানি ও করদাতার অর্থ অপচয় ঘটাবে।
এদিকে ইসরায়েলি সম্প্রচার মাধ্যম কান-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ফিরিয়ে আনতে শুরু করেছে, যা ইরানে ভবিষ্যৎ হামলায় ইসরায়েলের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দিতে পারে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাতজের সঙ্গে বৈঠক করে সংঘাতে নতুন করে সম্পৃক্ততার বিষয়ে আলোচনা করছেন বলেও জানা গেছে।
