তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট ব্যবস্থা ফিরল
প্রধান সম্পাদক
বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে দেওয়া হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ।
বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ এ রায় দেন। এর ফলে সংবিধানে গণভোট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরল বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।
রায় ঘোষণার পর অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘হাইকোর্ট ডিভিশন চারটি বিষয়ের ওপর পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে ফিরে আসা, গণভোট ফিরে আসা এবং সংবিধানের সাতের ‘ক’, সাতের ‘খ’ এবং সুপ্রিমকোর্টের যে রিটের যে ক্ষমতা, সেই ক্ষমতা। এই রায়ের ফলে হাইকোর্টের যে রায়, সেই রায়টি বহাল থাকল। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরে এলো।’ তিনি বলেন, ‘পঞ্চদশ সংশোধনীতে অন্যান্য যত পরিবর্তন আনা হয়েছিল, সেই বিষয়ে জাতীয় সংসদ সিদ্ধান্ত নেবে।’
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে। রায়ের কপি পাওয়ার পরে সংবিধান সংশোধন কমিটি হবে, আইনি প্রক্রিয়ায় যেভাবে আসে, সেভাবে রায় বাস্তবায়ন করা হবে।’
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ২০১১ সালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত করার পাশাপাশি সংবিধানের ৫৪টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিমার্জন ও প্রতিস্থাপন করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ কয়েকজনের করা একটি রিট আবেদনের নিষ্পত্তি করে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ বাতিল ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। ওই রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরার পথ তৈরি হয়।
কিন্তু তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের দাবিতে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে রিটকারীপক্ষ। পাশাপাশি নওগাঁর বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন এ মামলায় পক্ষভুক্ত হয়ে আলাদাভাবে আপিল করেন। এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার আরেকটি আপিল করেন এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি নামের একটি সংগঠন লিভ টু আপিল করে শুনানিতে অংশ নেয়। সোমবার থেকে তিন দিনের শুনানিতে পক্ষগুলো তাদের মতামত তুলে ধরে। এরপর বৃহস্পতিবার আপিল বিভাগ যে সিদ্ধান্ত দিলেন, তাতে হাইকোর্টের রায়ের কোনো পরিবর্তন ঘটল না।
রায়ের পর জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, আজকের এই রায় ঐতিহাসিক। আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগে যে রায় হয়েছিল, সেটি বহাল রাখা হয়েছে। এর অর্থ হলো, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগ যে চারটি বিষয়কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন, সেই বিষয়গুলো অসাংবিধানিক ঘোষিত থাকবে।
এছাড়া বাকি যে বিষয়গুলো আছে, সেগুলো সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। যে চারটি বিষয় হাইকোর্ট অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন, তার মধ্যে এক নম্বর ছিল, বর্তমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭(ক) ও ৭(খ)। ৭(ক) ও ৭(খ) ছিল-এই সংবিধানের কতগুলো বিষয় আছে, যেগুলো পরিবর্তন করা যাবে না। যদি কেউ পরিবর্তন করে, তাহলে সেটা হবে সাংবিধানিক রাষ্ট্রদ্রোহ। হাইকোর্ট বিভাগ এই অনুচ্ছেদকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন। আপিল বিভাগে এই অনুচ্ছেদ অসাংবিধানিক থেকে গেল।
দ্বিতীয়ত, হাইকোর্ট বিভাগ গণভোটের যে বিধান ছিল, সেই গণভোটের বিধানকে পুনঃপ্রবর্তন করেছিলেন। আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে গণভোটের বিধান পুনঃপ্রবর্তিত হলো। তৃতীয়ত, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৪(২) অনুযায়ী নিম্ন আদালতকে রিটের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। হাইকোর্ট বিভাগ এই রিটের ক্ষমতা প্রদানকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন। আপিল বিভাগ এই অসাংবিধানিক ঘোষণা করার জায়গাটিকে অসাংবিধানিক রেখেছেন। অর্থাৎ হাইকোর্ট বিভাগ ছাড়া আর কোনো আদালতে রিট আবেদন করার কোনো এখতিয়ার থাকবে না।
চতুর্থ বিষয়টি হলো-পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানকে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছিল। হাইকোর্ট বিভাগ এটাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন। আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগ যে বাতিল করেছেন, সে বিষয় বহাল থাকবে। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে আসতে আর কোনো বাধা থাকল না।
আদালতে সুজন সম্পাদকসহ চার ব্যক্তির পক্ষে আইনি লড়াই করেন আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। তার সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী কারিশমা জাহান ও রেদুয়ানুল করিম। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেলের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির পক্ষে আইনজীবী ইমরান এ সিদ্দিক এবং মোফাজ্জল হোসেনের পক্ষে আইনজীবী এএসএম শাহরিয়ার কবির শুনানি করেন।
ইন্টারভেনার বা তৃতীয় পক্ষ হিসাবে যুক্ত একটি সংগঠনের পক্ষে আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিক এবং ইন্টারভেনার হিসাবে আইনজীবী হামিদুল মিসবাহ শুনানিতে অংশ নেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক।
কী ছিল পঞ্চদশ সংশোধনীতে ? : ২০১১ সালের ৩০ জুন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী বিলটি পাশ হয় এবং ওই বছরের ৩ জুলাই রাষ্ট্রপতি তাতে অনুমোদন দিয়ে গেজেট প্রকাশ করেন। এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৫৪টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিমার্জন ও প্রতিস্থাপন আনা হয়েছিল। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বাতিল করা। এতে নির্বাচনের বিধান হিসাবে পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে অর্থাৎ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিষয়টি সংযোজন করা হয়।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ইসির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালত কোনো নির্দেশ দিতে পারবেন না বলে বিধান যুক্ত করা হয়েছিল। এছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসাবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং সংবিধানে জাতীয় চার মূলনীতি, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা হয়। জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যা ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ এ উন্নীত করা হয়। অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকে রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ বিবেচনায় নিয়ে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধানও যুক্ত করা হয় এই সংশোধনীতে। পাশাপাশি সংবিধানে বঙ্গবন্ধুর ১৯৭১ সালের সাতই মার্চের ভাষণ, ছাব্বিশে মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
কী ছিল হাইকোর্টের রায়ে? : ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা ফেরানোর দাবি জোরালো হয় এবং ওই বছরের ১৮ আগস্ট সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, তোফায়েল আহমেদ, এম হাফিজ উদ্দিন খান, জোবাইরুল হক ভূঁইয়া ও জাহরা রহমান হাইকোর্টে প্রথম রিট আবেদন করেন। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ১৯ আগস্ট রুল জারি করেন বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর রায়ের হাইকোর্ট বেঞ্চ। পঞ্চদশ সংশোধনী কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চাওয়া হয় সেই রুলে।
পরে অক্টোবরে নওগাঁর রানীনগরের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেন পঞ্চদশ সংশোধনীর ১৭টি ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আরেকটি রিট আবেদন করেন। এই দ্বিতীয় রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২৯ অক্টোবর বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল জারি করেন। পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সংগঠন এ মামলায় যুক্ত হয়। রুল শুনানির পর্যায়ে আদালতকে আইনি সহায়তা করতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, গণফোরাম, জামায়াতে ইসলামী, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশসহ বেশকিছু সংস্থা ও বিশিষ্ট ব্যক্তি ইন্টারভেনার হিসাবে যুক্ত হন।
২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে রিট মামলার রায় ঘোষণা করেন। ওই রায়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তিসংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ৭ক, ৭খ, এবং ৪৪(২) অনুচ্ছেদ বাতিল ঘোষণা করা হয়।
এছাড়া সংবিধানে গণভোটের বিধান বিলুপ্তিসংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ৪৭ ধারা বাতিল ঘোষণা করে দ্বাদশ সংশোধনীর ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হয়। আদালতের রায়ে বলা হয়, পঞ্চদশ সংশোধনী আইনটি পুরোপুরি বাতিল করা হয়নি, বরং বাকি বিধানগুলোর বিষয়ে আগামী জাতীয় সংসদ জনগণের মতামত নিয়ে সংশোধন বা পরিবর্তন করতে পারবে।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ : ২০২৫ সালের ৮ জুলাই প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় তুলে ধরেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে নির্বাচন ব্যবস্থাকে ‘দলীয়করণের’ মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ‘গণতন্ত্র’ ও ‘জনগণের সার্বভৌমত্ব’ ধ্বংস করা হয়েছে।
হাইকোর্ট বলেন, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত হয়েছিল ‘সাধারণ মানুষের ঐকমত্য এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবির ফসল’ হিসাবে। এই ব্যবস্থা বাতিলের ফলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে নাগরিকদের ভোটাধিকার ‘হরণ’ করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের জন্ম দেয়।
