১,৮৫০ কোটি টাকার এলএনজি কেনাকাটা, কমিশন-বাণিজ্যের ঝুঁকি কতটা
অনলাইন নিউজ ডেক্স
নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ বজায় রাখতে দুই কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করছে সরকার। সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বিপি সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেডের কাছ থেকে কেনা এ দুই কার্গোর পেছনে সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ১ হাজার ৮৫০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। বড় অঙ্কের এ সরকারি কেনাকাটায় মূল্য নির্ধারণ, সরবরাহকারী নির্বাচন এবং সংশ্লিষ্টদের কমিশন বা মধ্যস্থতাকারী ব্যয়ের সুযোগ কতটা রয়েছে, তা নিয়ে স্বচ্ছতার প্রশ্ন উঠছে।
গতকাল সোমবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ ক্রয়প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) ২০২৫-এর সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক রিকোয়েস্ট ফর কোটেশন (আরএফকিউ) পদ্ধতিতে প্রস্তাবটি উপস্থাপন করে।
অনুমোদন অনুযায়ী, প্রথম কার্গোটি ২৩ ও ২৪ আগস্ট সরবরাহের কথা রয়েছে। প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ধরা হয়েছে ২১ দশমিক ৮৭৮ ডলার। অগ্রিম আয়করসহ এ কার্গোর জন্য ব্যয় হবে ৯২৭ কোটি ৫০ লাখ ৬০ হাজার ৮৩৩ টাকা। দ্বিতীয় কার্গোটি ৪ ও ৫ সেপ্টেম্বর সরবরাহের জন্য অনুমোদিত হয়েছে। এতে প্রতি এমএমবিটিইউর দাম ২১ দশমিক ৭৭৮ ডলার এবং অগ্রিম আয়করসহ মোট ব্যয় ৯২৩ কোটি ২৬ লাখ ৬৬ হাজার ৩৬৯ টাকা। এই দাম স্পট মার্কেটের সর্বোচ্চ দর থেকেও বেশী, বর্তমানে জেকেএম (JKM-Japan Korea Marker) এ এলএনজি’র মূল্য প্রতি এমএমবিটিইউর দাম ১৮.৪৫ থেকে ২১.৬২ মধ্যে রয়েছে।
এলএনজি আমদানিতে সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয়ের কারণে প্রশ্ন উঠছে, অনুমোদিত দামের মধ্যে পণ্যের প্রকৃত আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য, পরিবহন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ের বাইরে সরবরাহকারী বা সংশ্লিষ্ট মধ্যস্থতাকারীদের কী পরিমাণ মার্জিন বা কমিশন রয়েছে। এ ধরনের তথ্য সাধারণত ক্রয়প্রক্রিয়ার নথি ও চুক্তির বিস্তারিত পর্যালোচনা ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। ফলে দুই কার্গোর ক্ষেত্রে সরকার যে দামে এলএনজি কিনছে, তা আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় কতটা প্রতিযোগিতামূলক—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সরকারি বড় অঙ্কের ক্রয়ে কমিশন বা মধ্যস্থতাকারী ব্যয়ের সুযোগ তৈরি হলে শেষ পর্যন্ত তার বোঝা পড়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর। বিশেষ করে জরুরি ভিত্তিতে কিংবা সীমিত সময়ের মধ্যে করা ক্রয়ে বাজার যাচাই ও দর তুলনার সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকায় মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় বাড়তি স্বচ্ছতা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে এ দুই কার্গো এলএনজি কেনার ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম, কমিশন লেনদেন বা সরকারি অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে—এমন কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে বিষয়টি অভিযোগ হিসেবে নয়, বরং বিপুল সরকারি অর্থের এ ধরনের ক্রয়ে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত ও মূল্য কারসাজির ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে দেখার বিষয় হিসেবে সামনে আসছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এলএনজি কেনার ক্ষেত্রে শুধু প্রতি এমএমবিটিইউর দাম প্রকাশ করলেই ক্রয়ের স্বচ্ছতা পুরোপুরি নিশ্চিত হয় না। কোন কোন প্রতিষ্ঠান কোটেশন দিয়েছে, তাদের প্রস্তাবিত দাম কত ছিল, চূড়ান্ত সরবরাহকারী কীভাবে নির্বাচিত হয়েছে, চুক্তিতে কী ধরনের কমিশন বা ট্রেডিং মার্জিন রয়েছে এবং আনুষঙ্গিক ব্যয় কত—এসব তথ্য প্রকাশ হলে সরকারের প্রকৃত ক্রয়মূল্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আবাসিক খাতে গ্যাসের চাহিদা মেটাতে দ্রুত এলএনজি আমদানির প্রয়োজন হয়েছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতেই আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের জন্য কার্গো দুটি কেনা হচ্ছে।
জরুরি গ্যাস চাহিদা মেটাতে এলএনজি কেনার প্রয়োজন থাকলেও ১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকার এ ক্রয়ে সরকারের অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ক্রয়মূল্যের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারদর, সরবরাহকারীর মার্জিন এবং সংশ্লিষ্ট সব ধরনের চার্জ ও কমিশনের হিসাব প্রকাশ করা গেলে সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হয়েছে কি না, তা যাচাই করা সম্ভব হবে।
