তুরাগ হত্যাকাণ্ড: বিবিসি বাংলার অনুসন্ধানে উঠে এলো লীগ কর্মীদের নির্মমভাবে হত্যার আরও বিশদ তথ্য


তুরাগ হত্যাকাণ্ড: বিবিসি বাংলার অনুসন্ধানে উঠে এলো লীগ কর্মীদের নির্মমভাবে হত্যার আরও বিশদ তথ্য
তুরাগ নদের আশুলিয়া ঘাটে গত ২২শে জুন আওয়ামী লীগের একদল নেতাকর্মীকে ঘিরে ঘটে যাওয়া এক ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক চলছে। ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে গ্রেপ্তার, নদীতে ঝাঁপ দিয়ে নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ এবং পরবর্তী চার দিনে তুরাগ নদ থেকে একাধিক মরদেহ উদ্ধার। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে নানা গুজব, সন্দেহ ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। প্রকৃত ঘটনা জানতে বিবিসি বাংলা কথা বলেছে পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী, নিহতদের পরিবার, মিছিলে অংশ নেওয়া এক আওয়ামী লীগ কর্মী এবং গ্রেপ্তারকৃতদের আইনজীবীর সঙ্গে। ২২শে জুন যা ঘটেছিল দলের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আওয়ামী লীগের ব্যানারে একটি মিছিলের আয়োজন করা হয়েছিল বলে জানান মিছিলে অংশ নেওয়া এক কর্মী, যিনি নিরাপত্তার কারণে নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি। তার ভাষ্যমতে, তুরাগ বেড়িবাঁধের পঞ্চবটি ও রুস্তমপুর ঘাটের মাঝামাঝি এলাকায় মিছিল শেষে ৬০-৬৫ জন কর্মী একসঙ্গে ট্রলারে করে নদীপথে নিরাপদে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পুলিশ ও প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক কর্মীদের নজর এড়াতেই এই পথ বেছে নেওয়া হয়েছিল বলে তিনি জানান। তিনি জানান, রুস্তমপুরে নামার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর তারা আশুলিয়া ঘাটকে নিরাপদ ভেবে সেখানে ট্রলার ভেড়ান। কিন্তু ট্রলার ভেড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ ও বিএনপি-জামায়াতের লোকজন হামলা চালায়, যার ফলে কর্মীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যে যেভাবে পারেন পালানোর চেষ্টা করেন। এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে ৭ জনকে আটক করা হয় এবং কয়েকজন কর্মী আতঙ্কে নদীতে ঝাঁপ দেন বলে তিনি জানান, যাদের মধ্যে প্রাথমিকভাবে ৭ জন নিখোঁজ হওয়ার কথা বলা হয়। তার ভাষ্য মতে, এই ৭ জনের মধ্যে তিনজনের মরদেহ পরবর্তীতে উদ্ধার হয়, বাকি চারজনের সঙ্গে যোগাযোগ না হলেও তারা জীবিত আছেন বলে তার কাছে তথ্য রয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া ৭ জনও তাদের আইনজীবীর কাছে অভিযোগ করেছেন, আটকের সময় পুলিশ ও সাদা পোশাকের লোকজন তাদের ধাওয়া দিয়েছিল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আশুলিয়ার এক প্রত্যক্ষদর্শীও বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, সেদিন ঘাটে কিছু মানুষকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ার ঘটনা তার নজরে এসেছিল, তবে আতঙ্কে তিনি দ্রুত সেখান থেকে চলে যান। গ্রেপ্তারকৃতদের আইনজীবী আরিফ সরকার পাভেল বিবিসি বাংলাকে জানান, ২৮শে জুন রিমান্ড শুনানির দিন তার মক্কেলদের সঙ্গে কথা হয়েছিল। তাদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, মিছিলের তথ্য কোনোভাবে ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর আশুলিয়ার নেতাকর্মী ও পুলিশ ঘাটে ট্রলার ভেড়ানোর সময়ই ধাওয়া ও হামলা চালায়, যার জেরে উপস্থিত ব্যক্তিরা যে যেভাবে পারেন পালাতে শুরু করেন এবং কেউ কেউ নদীতে ঝাঁপ দেন। উদ্ধারকৃত মরদেহ পুলিশ ও বিএনপি নেতাদের বক্তব্য আশুলিয়া থানা পুলিশ অবশ্য এই দাবিগুলো পুরোপুরি অস্বীকার করেছে। তাদের ভাষ্য, গ্রেপ্তারের স্থান থেকে কারো নদীতে পড়ে নিখোঁজ বা মৃত্যুর অভিযোগ ভিত্তিহীন। স্থানীয় বিএনপি নেতারাও ঘটনাস্থলে তাদের দলের কেউ উপস্থিত ছিল বলে অস্বীকার করেছেন। আশুলিয়া থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল গফুর বলেন, সেখানে তাদের দলের কোনো কর্মী যাননি, তবে ঠিক কাদের লোক সেখানে গিয়েছিল তা তিনি জানাতে পারেননি। একই দাবি করেছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতাও, যিনি বলেন এমন কোনো ঘটনার কথা তিনি জানেন না এবং কর্মীদের জিজ্ঞাসা করেও একই উত্তর পেয়েছেন। নিহতদের পরিচয় ও পরিবারের বক্তব্য মিছিলে অংশ নেওয়া ওই আওয়ামী লীগ কর্মী জানান, তুরাগ থেকে উদ্ধার হওয়া তিনজনের মধ্যে সুমন ও আরিফ ২২শে জুনের মিছিলের পর থেকে নিখোঁজ ছিলেন। তার ভাষ্যে, সুমন যুবলীগ এবং আরিফ ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আরিফের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। সুমনের বাবা-মা বর্তমানে ঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। পরিবারের পক্ষে গণমাধ্যমে কথা বলছেন তার খালু জুয়েল বাবু। তিনি বিবিসি বাংলাকে জানান, সুমন যে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তা তারা আগে জানতেন না। ২২ তারিখ মিছিলের কর্মীদের কাছ থেকে সুমনের নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে তারা থানায় যোগাযোগ করেন এবং নদীতে খোঁজ শুরু করেন। জুয়েল বাবুর বরাত দিয়ে জানা যায়, সুমনের মরদেহ উদ্ধারের সময় তার পকেট থেকে পাঁচটি মোবাইল ফোন পাওয়া যায়। মিছিলে অংশ নেওয়া ওই আওয়ামী লীগ কর্মী জানান, এর মধ্যে তিনটি ফোন ছিল মিছিলের অন্য কর্মীদের, যা মিছিলের ছবি ও ভিডিও ধারণকারীর কাছ থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য সুমনের কাছে দেওয়া হয়েছিল। বাকি দুটি ফোন সুমনের নিজের বলে তিনি জানান। পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, আশুলিয়া ব্রিজের কাছে সুমনের মরদেহ উদ্ধারের খবর পুলিশই তাদের দিয়েছিল। ঘটনার চার দিন পর উদ্ধার হওয়া মরদেহে কিছু লালচে দাগ দেখতে পান তারা, যেগুলো আঘাতের চিহ্ন হতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেন। পরিবার আরও জানায়, মরদেহ উদ্ধারের সময় তার চোখ ছিল না। তবে এসব সন্দেহ সত্ত্বেও পরিবার হত্যা মামলা নয়, বরং একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করেছে, যেখানে বন্ধুদের সঙ্গে পিকনিকে গিয়ে পানিতে ডুবে মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করে জুয়েল বাবু বলেন, পুলিশ তাদের কার বিরুদ্ধে মামলা করতে চান তা জিজ্ঞাসা করেছিল, কিন্তু তারা কারো নামে মামলা না করে শুধু মরদেহ ফেরত চেয়েছিলেন। পরে পুলিশের পরামর্শেই তারা অপমৃত্যু মামলা করেন এবং এতে সুমনের সৎভাই সালাউদ্দিনকে স্বাক্ষর করতে বলা হয়। সুমনের নামে ও ছবি সংবলিত একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টে আওয়ামী লীগের সমর্থনে মিছিলের একাধিক পোস্ট পাওয়া গেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ছবিতে সুমনের উপস্থিতি পরিবার নিশ্চিত করলেও অ্যাকাউন্টটি বর্তমানে নিষ্ক্রিয় করা রয়েছে। সবশেষে জুয়েল বাবু বলেন, সুমন যে মিছিলে গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকেই এই ঘটনার সূত্রপাত, তা তারা মেনে নিচ্ছেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তারা কাউকে দোষারোপ করছেন না এবং কারো বিরুদ্ধে তাদের কোনো অভিযোগ নেই। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সুমন পানিতে ডুবেই মারা গেছেন। এখনো অমীমাংসিত প্রশ্ন তুরাগের এই ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট অসঙ্গতি রয়ে গেছে। একদিকে আওয়ামী লীগ কর্মী ও গ্রেপ্তারকৃতদের অভিযোগ পরিকল্পিত হামলা ও ধাওয়ার, অন্যদিকে পুলিশ ও বিএনপি নেতারা এমন কোনো ঘটনার কথা অস্বীকার করছেন। নিহতদের পরিবারের বক্তব্যেও রয়েছে দ্বিধা— একদিকে মরদেহে আঘাতের সন্দেহজনক চিহ্ন ও চোখ না থাকার কথা জানানো হলেও, আনুষ্ঠানিকভাবে হত্যা নয় বরং অপমৃত্যুর মামলাই দায়ের করা হয়েছে। ফলে ২২শে জুনের ঘটনার প্রকৃত চিত্র নিয়ে ধোঁয়াশা এখনো কাটেনি। (তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অবলম্বনে)

সর্বশেষ :

মাদক নির্মূলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো তৎপর হতে   মাদক নির্মূলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো তৎপর হতে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাল্যবিবাহ ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে ।   চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাল্যবিবাহ ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে । চাঁপাইনবাবগঞ্জে হেরোইন ও ইয়াবাসহ আটক ১   চাঁপাইনবাবগঞ্জে হেরোইন ও ইয়াবাসহ আটক ১ চাঁপাইনবাবগঞ্জ আইনজীবী সমিতি ভবনের সামনে মানববন্ধন ও ডিসির কাছে স্মারকলিপি   চাঁপাইনবাবগঞ্জ আইনজীবী সমিতি ভবনের সামনে মানববন্ধন ও ডিসির কাছে স্মারকলিপি বিজিবির অভিযানে ভারতীয় মোবাইল ফোন ও মোটরসাইকেলসহ ০২ জন আসামী আটক।   বিজিবির অভিযানে ভারতীয় মোবাইল ফোন ও মোটরসাইকেলসহ ০২ জন আসামী আটক। কাশিয়ানীতে পূবালী ব্যাংকের উদ্যোগে ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ শীর্ষক ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত   কাশিয়ানীতে পূবালী ব্যাংকের উদ্যোগে ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ শীর্ষক ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত বনের নৈসর্গিক পরিবেশে বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতির অনন্য মিলনমেলা: নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হলো চতুর্থ রকল্যান্ড রিট্রিট ও বইমেলা ২০২৬   বনের নৈসর্গিক পরিবেশে বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতির অনন্য মিলনমেলা: নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হলো চতুর্থ রকল্যান্ড রিট্রিট ও বইমেলা ২০২৬ হরমুজ প্রণালিতে মাইন বিস্ফোরণে তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংস!   হরমুজ প্রণালিতে মাইন বিস্ফোরণে তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংস!