মিডিয়ায় তেলেসমাতিঃ “লেজ কুকুরকে নাচাচ্ছে, নাকি কুকুর লেজকে নাচাচ্ছে?”
প্রধান সম্পাদক
বসুন্ধরা, বিএনপি সরকারের ফাঁদে পড়েছে, নাকি বিএনপি সরকার বসুন্ধরার ফাঁদে পড়েছে, তা নিয়ে মিডিয়া পাড়ায় নানা কথা শোনা যাচ্ছে। বিএনপির রাজনীতিতে এবং নিজের দলের অভ্যন্তরীণ ও শীর্ষ নেতৃত্বকে ব্যঙ্গ করতে যুদ্ধাপরাধের দায়ে দন্ডিত রাজাকার সাকাচৌ একটি উক্তি করেছিলেন,
“আগে কুকুর লেজ নাড়াত, আর এখন লেজে কুকুর নাড়ায়”
কে কাকে নাড়াচ্ছে আর কোনটা লেজ আর কোনটা কুকুর, এটা বর্তমানে মিডিয়াপাড়ায় সর্বস্তরে আলোচিত একটি রহস্য।
ব্যারিস্টার গিয়াস উদ্দিন রিমনঃ লন্ডন টু পিএম অফিস ভায়া বসুন্ধরা
বর্তমানে সচিব পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার গিয়াস উদ্দিন রিমন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিনিধি হিসেবে বসুন্ধরা মিডিয়ার ডিএমডি হয়েছিল। লন্ডনে ব্যারিস্টার রিমন তারেক রহমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ট একজন মানুষ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। ২০২৫ এর এপ্রিলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে তারেক রহমানের সুপারিশে বসুন্ধরায় ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে নিয়োগ পাওয়া রিমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালীন সময়ে শিবিরের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন, তৎকালীন ছাত্রদলের নেতাদের হাতে উত্তমমাধ্যম খাবার ইতিহাস রয়েছে তার।
২০২৫ এর শুরুতে বসুন্ধরার সাতটি গণমাধ্যমের মাদার কোম্পানি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া পিএলসির দায়িত্ব অর্পণ করা হয় রিমনের হাতে। মিডিয়া মহলে রিমন সম্পর্কে যে কথাটি প্রচলিত আছে, সেটা হচ্ছে
“এখানে চেটেপুটে খেয়ে, বসুন্ধরার মিডিয়া ধ্বংস করে অনুগতদের হাতে দায়িত্ব দিয়ে সুতো নিজের কাছে রেখেছে লিমন। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী পদের ক্ষমতাবলে বসুন্ধরা মিডিয়াসহ অন্যান্য মিডিয়ার গডফাদার বনে যাওয়া রিমন কৌশলে বাংলাদেশের মিডিয়ায় গুপ্ত শিবিরকে সুযোগ করে দিচ্ছে।”
সাংবাদিক মহলে অনুসন্ধানের সুত্রে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে রিমন শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। সে কারণে ক্যাম্পাসে থাকাকালীন রিমন ছাত্রদলের কর্মীদের হাতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিতও হয়। তখন সে বাঁচার জন্য দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতা শুরু করে। ইনকিলাবে তখন পরীক্ষীত শিবির বা ধর্মীয় রাজনীতির লোকজন ছাড়া কাউকে নেওয়া হতোনা। এরপরে বিএনপি’র ২০০১-২০০৬ শাসনামলে হাওয়া ভবনের কোটায় পুলিশেও চাকরি পায়, এবং তেজগাঁও জোনের এসি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
মিডিয়া দখলঃ নাম বিএনপি’র, কাজ শিবিরের
সম্প্রতি বসুন্ধরা মিডিয়াকে জামায়াতমুক্ত করার নামে বসুন্ধরার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার বাংলাদেশ প্রতিদিন থেকে বিএনপি সমর্থক এবং প্রতিষ্ঠানের নিবেদিতপ্রাণ পুরোনো নিরপেক্ষ ৪০ জন সাংবাদিককে চাকরিচ্যুত করা হয়। তাদের অপরাধ তারা গুপ্ত শিবিরের বিরোধী। কিন্তু রিমন তাদেরকে জামায়াত ট্যাগ লাগিয়ে চাকরিচ্যুত করে। অথচ চাকরিচ্যুত হওয়া কেউই কখনো জামায়াতের রাজনীতি করেনি। বরং ছাত্র জীবনে জামায়াতবিরোধী রাজনীতি করেছে। তবে চাকুরিচ্যুতদের বেশিরভাগই বিএনপির রাজনীতির সমর্থক।
জানা গেছে শিবির নেতা ও নয়া দিগন্তের সাংবাদিক আবুল কালামসহ অনেক জামায়াত কর্মী বাংলাদেশ প্রতিদিনে এখনো বহাল তবিয়তে আছে। কিন্তু নিরপেক্ষ ও বিএনপির সমর্থক সাংবাদিকদের তাড়ানো হচ্ছে, যার পিছনে মূল কলকাঠি নাড়ছে “মিডিয়া গডফাদার” ও বর্তমানে সচিব পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার গিয়াস উদ্দিন রিমন।
বসুন্ধরার সাংবাদিকদের সূত্রে জানা গেছে আবুল কালাম একসময় মুনিয়া হত্যাকাণ্ড নিয়ে বসুন্ধরার এমডি আনভীরের বিরুদ্ধে ফেসবুকে ব্যাপক সোচ্চার ছিল। তাকে ম্যানেজ করতে বাংলাদেশ প্রতিদিনে বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে চাকরি দেওয়া হয়। কালাম কোনো দিন বাংলাদেশ প্রতিদিনে অফিস করেনি। সে কাজ করে নয়া দিগন্তে, অথচ বিনা কাজে মাসে মাসে বাংলাদেশ প্রতিদিন থেকে বেতন পায়।
বসুন্ধরা মিডিয়াগ্রুপের সর্বেসর্বা ব্যারিস্টার রিমন
৫ আগস্টের পর দাপটের সাথে দৃশ্যপটে আসা লিমন ২০২৫ এর শুরুতে বসুন্ধরার ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপে ডিএমডি হবার পর পরই বাংলাদেশ প্রতিদিনের নয়াদিল্লি ও কলকাতার প্রতিনিধিদের চাকরি বহাল রেখে বাদ দেওয়া হয়েছে লন্ডন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদেরও। একইসাথে কাদের গণিকে সরিয়ে চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান এর দপ্তরে সংযুক্ত করে ঢাল তলোয়ারহীন করে দেয়া হয়। অল্প সময়ের মধ্যে চাকরি থেকে রিজাইন দেন এনসিপির সাথে সুসম্পর্ক রাখা ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়ার এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ইয়াসিন পাভেল। সেই সময় বসুন্ধরা মিডিয়াগ্রুপে সর্বেসর্বা বনে যাওয়া রিমনের নারী কেলেংকারীর ঘটনাও শোনা যায় মিডিয়াপাড়ায়। বিভিন্নসূত্রে জান্নাতুল সাদিয়া ও নুজহাত আফরিনের নামক দুজন উপস্থাপিকার কথা জানা যায়।
মিডিয়া দলীয়করণ, নাকি দলীয়মুক্তকরণ
এখন প্রশ্ন ওঠেছে বসুন্ধরা কার ফাঁদে পড়েছে? নিজেদের পরীক্ষিত পুরোনো কর্মীদের জামায়াত ট্যাগ লাগিয়ে বাদ দিয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিন ধ্বংস করার ফাঁদে, নাকি সরকারকে নতুন কোনো ফাঁদে ফেলার কৌশল নিয়েছে? নাকি আসলে ফাঁদ পেতে অন্য কেউ অপেক্ষা করছে?
বসুন্ধরা মিডিয়ার বাংলাদেশ প্রতিদিন, কালের কণ্ঠ, বাংলানিউজ, নিউজ টোয়েন্টিফোর টেলিভিশন, টি স্পোর্টস ও রেডিও ক্যাপিটালের সম্পাদকদের নাম এখন সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, সাংবাদিকতা পেশার সাথে দীর্ঘদিন কাজ করছে এমন অনেকেই জানে না। কারণ, তারা এতটাই অখ্যাত যে তাদেরকে মিডিয়াপাড়ার কেউ চেনেনা। সম্পাদক হওয়ার যোগ্যতা নিয়েও মিডিয়াপাড়ায় বিভিন্ন আলোচনা রয়েছে।
বসুন্ধরা মিডিয়া জন্মের পর থেকেই যখন যে সরকার থাকে, সে সরকারের পক্ষে কাজ করে থাকে। ইউনূসের ১৮ মাস প্রায় প্রতিদিন ইউনূসের প্রশংসা করে প্রথম পাতায় বিশেষ লেখা লিখেছে। ইউনূসের বিদায়ের পর আবার ইউনূসের বিরুদ্ধে লিখছে। এখন আবার তারেক রহমানের প্রশংসায় ভাসছে বসুন্ধরা মিডিয়া।
বিএনপি পরিচয়ে গুপ্ত সংগঠনের কর্মীদের নিয়োগ
সম্প্রতি মিডিয়াগুলো চালানোর জন্য ও বিভিন্ন মামলা, জব্দ ব্যাংক হিসাব খুলতে, সরকারের গুণগান করার জন্য কিছু অপেশাদার সাবেক গুপ্ত শিবির কর্মীকে প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পদে নিয়োগ দিয়েছে বসুন্ধরা। বিএনপির পক্ষ থেকে ব্যারিস্টার রিমন তার একসময়ের বন্ধু শিবির কর্মী লোটন একরামকে (যে একসময় দৈনিক বাংলার টেলিফোন অপারেটর ছিল), আফাজউদ্দিন বিপ্লব ও মাসুদ করিমকে বাংলাদেশ প্রতিদিনের শীর্ষ পদে বসিয়েছে।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের সাবেক সম্পাদক নঈম নিজামের ঘনিষ্ঠ সামসুল হক রাসেল ৫ আগস্টের পর চাচা বিএনপি নেতা নবীর নাম ভাঙ্গিয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রভাব বিস্তার করে। সেই রাসেলই পুরাতন কর্মীদের ছাঁটাই করার মূল কারিগর বলে অনুসন্ধানে জানা যায়।
মিডিয়াপাড়ায় সরব প্রশ্ন গুপ্ত শিবির কর্মীদের দিয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনসহ বসুন্ধরা মিডিয়া ধ্বংস করবে, নাকি বিএনপির লোক সাজিয়ে শিবির কর্মীদের গুপ্ত সাংবাদিক হিসাবে বসুন্ধরা মিডিয়া গুলোতে প্রতিষ্ঠিত করবে? এ নিয়ে বসুন্ধরা হাউসের মিডিয়াপাড়ায় অস্থিরতা চলছে।
বিএনপি’র নাম ভাঙ্গিয়ে শিবিরের গুপ্ত রাজনীতি
বিএনপি এবার ক্ষমতায় এসে মিডিয়া দলীয়করণ শুরু করে, কিন্তু অনুসন্ধানে জানা যায় বিএনপি’র নাম ভাঙ্গিয়ে আদতে মিডিয়া হাউসগুলো-তে গুপ্ত দলের অভিজ্ঞতাহীন-যোগ্যতাহীনরা সাংবাদিক হিসাবে নিয়োগ পাচ্ছে। বিএনপি’র নাম ভাঙ্গিয়ে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে এখন গুপ্ত দলের সাথীরা, আর একে একে বিএনপি সমর্থিত ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকদের মিডিয়া থেকে ছাঁটাই করছে।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের কয়েকজন কর্মির সাথে বিডিডাইজেস্ট প্রতিনিধি কথা বলে। এক কর্মী বলেন, গুপ্ত শিবিরের নিয়ন্ত্রণে এখন বসুন্ধরা মিডিয়া। আরেকজন জানান “শিবিরের সদস্যরা বিএনপি বান্ধাব সাংবাদিক সেজে থাকার কৌশল অবলম্বন করেছে। তারা তারেক রহমান থেকে শুরু করে বিএনপি’র পক্ষে সংবাদ করে মিডিয়াতে তাদের অবস্থা পাকা করছে, আর “মিডিয়া গডফাদার” ব্যারিস্টার রিমন ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের মাধ্যমে ভিতরে ভিতরে সকল বাঁধা দূর করে মিডিয়ার কর্তৃত্ব নিজেদের হাতে নিচ্ছে।
ছাঁটাইকৃত বিএনপিপন্থী সাংবাদিকরাও অপেক্ষায় আছেন দেখার জন্য যে আখেরে কার লাভ হয়, বিএনপি নাকি বসুন্ধরা কুকুরের লেজ নাড়াচ্ছে? নাকি গুপ্ত শিবির কুকুরকে নাড়াচ্ছে?
