ইরাক ছাড়ল মার্কিন বাহিনী: দুই দশকের যুদ্ধের ক্ষত আর অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে বাগদাদ
অনলাইন নিউজ ডেক্স
বাগদাদ, ৩০ সেপ্টেম্বর: ২০০৩ সালের আগ্রাসনের পর দুই দশকের বেশি সময় ইরাকে থাকা মার্কিন সেনারা আজ বুধবারের মধ্যে দেশটির শেষ ঘাঁটিগুলো ছেড়ে যাচ্ছে। ইরান ও তার মিত্ররা এ পদক্ষেপকে নিজেদের বিজয় হিসেবে উদযাপন করছে। তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো, তেলনির্ভর অর্থনীতির ধস এবং নতুন করে মাথাচাড়া দেওয়া নিরাপত্তা শঙ্কার মধ্যে দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উত্তরের ইরাকি কুর্দিস্তান অঞ্চলে থাকা কয়েকশ মার্কিন সেনাও ৩০ সেপ্টেম্বরের সময়সীমার মধ্যে সেখান থেকে চলে যাবে। এর আগে পশ্চিম ইরাকের আইন আল-আসাদ ঘাঁটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ইরাকি সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, এবং মার্কিন বাহিনী নিজেদের সব সামরিক সরঞ্জাম সঙ্গে নিয়ে গেছে।
সময়সীমা নির্ধারণে ইরাকি সরকারের ভূমিকাই মুখ্য ছিল। এক ইরাকি কর্মকর্তা জানান, জুলাইয়ে ওয়াশিংটন সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদিই ৩০ সেপ্টেম্বরের জন্য চাপ দিয়েছিলেন। আগস্টে প্রধানমন্ত্রী এই সময়সীমাকে অপরিবর্তনীয় ঘোষণা করেন।
মিলিশিয়াদের উল্লাস, আইএস নিয়ে শঙ্কা
ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো প্রত্যাহারকে নিজেদের জয় হিসেবে দেখাচ্ছে। ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাকের কমান্ডার আবু মুজতাবা আল-ইয়াসিরি রয়টার্সকে বলেন, এটি মার্কিন প্রকল্পের বড় পরাজয়। কাতাইব হিজবুল্লাহ হুঁশিয়ারি দিয়েছে, ৩০ সেপ্টেম্বরের পর ইরাকের আকাশে কোনো “শত্রুভাবাপন্ন” উড়োজাহাজ দেখা গেলে তা ভূপাতিত করা হবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, ঝুঁকি শুধু মিলিশিয়াদের দিক থেকে নয়। এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রত্যাহারের ঘোষণা প্রকাশ্যে আসার পর দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে আইএসের সুপ্ত সেলগুলোর তৎপরতা চোখে পড়ছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৪ সালে জো বাইডেনের আমলে সম্মত হওয়া এই প্রত্যাহার এমন সময়ে কার্যকর হচ্ছে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে। এতে তেহরান ও তার মিত্ররা অবাধ সুযোগ পেতে পারে, আর আইএসসহ যুক্তরাষ্ট্রের অন্য শত্রুরাও ফিরে আসতে পারে। সেনা বিদায় ইরাকিদের কাছে সাধারণভাবে জনপ্রিয় হলেও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর শক্তি নিয়ে যাঁরা উদ্বিগ্ন, তাঁরা মনে করছেন সিদ্ধান্তটি অকালপক্ক।
জোটের প্রস্থান নিয়ে বাগদাদ ও কুর্দিস্তানের রাজধানী এরবিলের দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য আছে, যদিও দুই পক্ষই আইএসের পুনরুত্থান ঠেকাতে এবং উত্তরে স্থিতিশীলতা রক্ষায় আগ্রহী। ইরাক এখন যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে আলাদা আলাদা দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা সহযোগিতায় যেতে চায়।
বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছে ইরাকের সরকার
নিরাপত্তার পাশাপাশি বড় চাপ আসছে অর্থনীতি থেকে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরাকের তেল রাজস্ব ৭০ শতাংশের বেশি কমেছে, আর আইএমএফ চলতি বছর অর্থনীতি ৬.৮ শতাংশ সংকুচিত হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে। তেল রাজস্ব ফেব্রুয়ারির ৬.৮ বিলিয়ন ডলার থেকে মে-জুনে নেমে এসেছে প্রায় ২.৩ বিলিয়ন ডলারে।
প্রধানমন্ত্রী আল-জাইদি বলেছেন, যুদ্ধের কারণে ইরাক প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের তেল রাজস্ব হারিয়েছে। কিছু সময় দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল স্বাভাবিক উপসাগরীয় পথে রপ্তানি করা যায়নি। রাষ্ট্রীয় তেল বিপণন সংস্থার প্রধান পার্লামেন্টকে জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরে রপ্তানি সক্ষমতা ছিল দৈনিক ৪২ লাখ ব্যারেল হলেও প্রকৃত গড় রপ্তানি ছিল ২৫ লাখ ব্যারেল। সংকটের আগে এটি ছিল ৩৫ লাখ।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে সরকারি কর্মচারীদের বেতনে। অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেছেন, বেতনের জন্য প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন দিনার দরকার হলেও সরকারের হাতে ছিল মাত্র প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন। ফলে বেতন দেরিতে ও কিস্তিতে দেওয়া হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে বেতন, পেনশন ও সামাজিক কল্যাণে ইরাকের মাসিক ব্যয় প্রায় ৬.৫ বিলিয়ন ডলার। রপ্তানি কমে যাওয়ায় বাগদাদে বিক্ষোভও হয়েছে, আর সরকারের বিবেচনায় থাকা কৃচ্ছ্রসাধনের পদক্ষেপগুলো জনগণের কাছে অজনপ্রিয়।
ইরাকের অর্থনীতি তেলের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে তেল সরকারি রাজস্বের ৯০ শতাংশ, রপ্তানি আয়ের ৯৫ শতাংশ এবং জিডিপির ৫৩ শতাংশের বেশি। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, সংকট ইরাকি অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা উন্মোচন করেছে, বিশেষ করে সংকট মোকাবিলার কোনো রক্ষাকবচ না থাকা।
রাজনৈতিক অচলাবস্থা পেরিয়ে নতুন সরকার
প্রায় ছয় মাসের অচলাবস্থার পর ১৪ মে আল-জাইদির ঐকমত্যের সরকার শপথ নেয়। তিনি পেশায় ব্যাংকার ও ব্যবসায়ী এবং রাজনীতিতে নবাগত। বসরা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের ভাষ্যে, ইরাকের আধুনিক ইতিহাসে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাহীন কোনো ব্যবসায়ী এই প্রথম প্রধানমন্ত্রী হলেন। গত নভেম্বরের নির্বাচনের পর নুরি আল-মালিকির প্রধানমন্ত্রিত্বের সম্ভাবনা মার্কিন ভেটোয় ভেস্তে গিয়েছিল। সমালোচকদের কেউ কেউ মনে করেন, এই মনোনয়ন রাজনৈতিক অভিজাতদের স্থিতাবস্থা রক্ষার প্রবণতাই দেখায়।
ধ্বংস ও প্রাণহানির দুই দশক
২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া উপস্থিতি ২০০৭ সালে চরমে পৌঁছায়, যখন ইরাকে মার্কিন সেনা ছিল ১ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে শেষ মার্কিন যোদ্ধা সেনারা দেশ ছাড়ে। এরপর আইএসের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে যে অভিযান শুরু হয়, তা ১২ বছর চলেছে। রয়টার্সের তথ্যে, ইরাকে দুই দশকের বেশি সময়ের মার্কিন সামরিক সম্পৃক্ততায় ৪,৫০০ আমেরিকান প্রাণ হারিয়েছেন।
ইরাকিদের ক্ষতি তার চেয়ে অনেক বেশি। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের “কস্টস অফ ওয়ার” প্রকল্পের হিসাবে সংঘাতে ২ লাখ ৯ হাজার পর্যন্ত ইরাকি নিহত হয়েছেন, যদিও সব মৃত্যু নথিভুক্ত হয়নি। এসব যুদ্ধে বাস্তুচ্যুত ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষের মধ্যে ৯২ লাখ ইরাকি, আর জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার তথ্যমতে এখনো প্রায় ১২ লাখ ইরাকি ঘরে ফিরতে পারেননি। বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে মৃতের সংখ্যায় পার্থক্য আছে; কিছু অনির্ভরযোগ্য উৎস এর চেয়েও বেশি সংখ্যা দেয়।
২০১৪ থেকে ২০১৭ সালে আইএস ইরাকের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে ইয়াজিদি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যাসহ ব্যাপক নৃশংসতা চালায়। আইএসবিরোধী সামরিক অভিযানে ব্যাপক নগর ধ্বংস হয়, বিশেষ করে মসুলে, এবং এ সময়ে বেসামরিক মৃত্যু এক লাখ ছাড়িয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এর মধ্যে শুধু মসুলেই প্রায় ১০ হাজার।
আইএসের তথাকথিত খিলাফতের রাজধানী মসুলের, বিশেষ করে ঐতিহাসিক পুরোনো শহরের, প্রায় ৬৫ শতাংশ ধ্বংস হয়ে যায়। ১ লাখ ৩৮ হাজারের বেশি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত বা বিধ্বস্ত হয়েছে, যার মধ্যে পশ্চিম মসুলেই ৫৩ হাজার। ২৬ হাজার পরিবার সম্পত্তি হারানোর ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে, কিন্তু একটি বিশ্লেষণ বলছে, বিদ্যমান ক্ষতিপূরণ কাঠামোতে ইরাক সরকার ও আন্তর্জাতিক জোটের পূর্ণ দায় স্বীকৃত হয়নি। পুনর্গঠনে ১০০ বিলিয়ন ডলার লাগতে পারে বলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল-আবাদি জানিয়েছিলেন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতিও পুনর্গঠনে বাধা হয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করেন।
চলতি বছরের ইরান যুদ্ধে ইরাকের অভ্যন্তরে অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির নির্ভরযোগ্য ও বিস্তারিত হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা তেহরানের নির্দেশে প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালিয়েছে, সর্বশেষ এ মাসেই সৌদি আরবের একটি বড় তেল পাইপলাইনে।
