রংপুরে ৪ খুন: কারণ হিসেবে হিন্দু সমাজের জাতপ্রথার দ্বন্দ্বের নয়া দাবি পুলিশের
অনলাইন নিউজ ডেক্স
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত জিলা স্কুল শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ দৃঢ়তার সাথে জানিয়েছেন যে, ইতোপূর্বে গ্রেপ্তারকৃত দুই আসামিই এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের মূল বাস্তবায়নকারী।
একই সাথে এ মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে কাজ করা সম্ভাব্য দুটি প্রধান অনুঘটকের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি।
২৭শে আগস্ট, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ জরুরি সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের এই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা তথ্যগুলো উপস্থাপন করেন।
তিনি জানান, ওই চার হত্যাকাণ্ডের পেছনে মূলত ভূমিসংক্রান্ত পুরনো বিরোধ এবং হিন্দু সমাজের জাতপ্রথা ও বৈষম্যজনিত ক্ষোভ মূল কারণ হিসেবে কাজ করে থাকতে পারে।
পুলিশ প্রধানের দাবি, নিহত গণপতি চক্রবর্তী গ্রেপ্তারকৃত আসামি সিদ্ধার্থের পূর্বপুরুষদের থেকে জমি কিনে নিজের বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। তবে সেই জমির অংশীদাররা তাদের ন্যায্য অর্থ পায়নি বলে একটি অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে রয়ে গেছে। তাছাড়া গণপতি চক্রবর্তী উচ্চবর্ণের (ব্রাহ্মণ) হওয়ার কারণে স্থানীয় মাছুয়াপাড়ার হিন্দু অধিবাসীদের তুলনামূলক নিচু জাতের মনে করতেন বলে জানা যায়।
রাস্তায় দেখা হলে কুশল বিনিময় করলেও তিনি কাউকেই নিজের বসতবাড়িতে প্রবেশের অনুমতি দিতেন না। মহল্লার বাসিন্দাদের সাথে তার এমন দূরত্ব ও মনস্তাত্ত্বিক ক্ষোভও এই হত্যাকাণ্ডের রূপ নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কমিশনার আরো দাবি করেন যে, নৃশংস এই অপরাধটি রাতের আঁধারে নয়, বরং গত বৃহস্পতিবার ভোরের আলো ফোটার সময় সংঘটিত হয়েছিল।
দুই অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের বিচারিক আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বরাত দিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ঘটনার রাতে আসামিরা তাদের অপর বন্ধু সীমান্তের বাড়িতে একত্রে চারটি ইয়াবা সেবন করে। পরবর্তীতে মাদকের মাত্রা বাড়াতে তারা শান্ত নামে এক মাদক ব্যবসায়ীর কাছে নিজেদের ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোন বন্ধক রেখে আরো চারটি ইয়াবা সংগ্রহ করে।
এরপর তারা সরাসরি গণপতির বাড়ির ছাদে উঠে পানির ট্যাংকের আড়ালে গিয়ে ইয়াবাসেবনে লিপ্ত হয়। ভোরের দিকে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে প্রাতঃভ্রমণে এলে তাদের দেখতে পান এবং তীব্র রাগারাগি ও চেঁচামেচি শুরু করেন। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার ভয়ে আসামিরা তৎক্ষণাৎ গণপতির গলায় তার পরনের গামছা পেঁচিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।
ছাদে গোলমালের শব্দ পেয়ে গণপতির স্ত্রী প্রীতিলতা এবং কন্যা আগামী দ্রুত সেখানে ছুটে আসেন। স্বামীকে নিথর অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে তারা চিৎকার শুরু করলে খুনিরা তাদের ওপরও চড়াও হয় এবং দড়ি ও গামছা গলায় পেঁচিয়ে দুজনকেই হত্যা করে।
এরপর খুনিরা নিচে নেমে ঘরে প্রবেশ করলে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রিয়মকে (আয়ুশ) বিছানায় বসা অবস্থায় দেখতে পায়। কিশোরটি আসামি সিদ্ধার্থকে চিনে ফেলে এবং তাদের উপস্থিতির কারণ জানতে চাইলে নিজেদের বাঁচাতে তাকেও শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এই শেষ হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয় দিনের আলো পুরোপুরি ফুটে ওঠার পর।
নিহতের ঘরের সামনের বিদ্যুতের খুঁটি থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়টি স্বীকার করে পুলিশ প্রধান বলেন, নৃশংসতার পর খুনিদের মনে ভয় জাগে যে ঘরে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলে তারা ধরা পড়ে যাবে। এই ভেবে সিদ্ধার্থ নিচে নেমে এসে মূল বিদ্যুতের তার কেটে দেয়, যার সময় অপর খুনি মুগ্ধ ঘরের ভেতরেই অবস্থান করছিল।
একে একে চারজনকে হত্যা করার পর অপরাধীরা মারাত্মক ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং বাথরুমে গিয়ে শরীরে পানি ঢালে, তবে তারা পূর্ণাঙ্গ গোসল করেনি। তাছাড়া জবানবন্দিতে শসা কিংবা খেজুর খাওয়ার কোনো তথ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে চিকিৎসকদের দেওয়া ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, চারজনকেই শ্বাসনালী চেপে ধরে হত্যা করা হয়েছে। একই সাথে নিহত মা কিংবা মেয়ের ওপর কোনো ধরনের যৌন নির্যাতনের আলামত পাওয়া যায়নি বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।
তবে শ্বাসরোধের প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে যে মল ও বীর্যপাতের ঘটনা ঘটে, এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি বলে পুলিশ জানায়।
সংবাদ সম্মেলন চলাকালে উপস্থিত সাংবাদিকদের উত্থাপিত অধিকাংশ প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট জবাব না দিয়েই পুলিশ কমিশনার স্থান ত্যাগ করলে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও তার সাথে যোগাযোগের সুযোগ না হওয়ায় সাংবাদিকরা ফিরে আসেন।
উক্ত সংবাদ সম্মেলনে মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তীসহ ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, গত শনিবার রাতের দিকে ওই বসতবাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি (৬০), তার স্ত্রী প্রীতিলতা (৫০), স্নাতকোত্তর স্তরে অধ্যয়নরত কন্যা আগামী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী পুত্র প্রিয়ম চক্রবর্তীর (১২) লাশ উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ঘটনার পরদিন রোববার নিহতের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের অভিযুক্ত করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলা দায়েরের দিন ভোরেই পুলিশি অভিযানে ওই এলাকা থেকে মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামের দুই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পরদিনই তারা বিচারকের কাছে ১৬৪ ধারায় নিজেদের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি প্রদান করে।
পরবর্তী সময়ে মঙ্গলবার আসামিদের বন্ধু সীমান্ত আদালতে উপস্থিত হয়ে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হিসেবে নিজের জবানবন্দি জমা দেন। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, এই তিনজন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পূর্বে এক সাথে ইয়াবা সেবন করেছিল।
বর্তমানে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব কোতোয়ালি থানা থেকে হস্তান্তর করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে ন্যস্ত করা হয়েছে এবং ডিবির পরিদর্শক জিনাত আলী প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
