খুলনায় ভাড়াটে খুনিদের হাতে হাতে থানা লুটের অস্ত্র: ৩ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই তরুণসহ ৬ মাসে প্রাণ গেল ৩৭ জনের
অনলাইন নিউজ ডেক্স
খুলনা নগরীর লবণচরা এলাকার আশিবিঘাতে গত ১৯শে আগস্ট রাতের মাত্র তিন ঘণ্টার ব্যবধানে মঞ্জুরুল ইসলাম ও নাজমুল শেখ নামের দুই তরুণকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
এই জোড়া খুনের পেছনে কোনো কিশোর গ্যাং কিংবা পেশাদার সন্ত্রাসী চক্রের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছে পুলিশ। এর আগে ১৮ই আগস্ট রূপসার নৈহাটি গ্রামে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে মামুন মীর নামের এক যুবককে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ফেলে যায় অপরাধীরা।
এছাড়া ১৫ই আগস্ট রূপসার দুর্জনীমহল গ্রামে জয় ঢালীকে গলা কেটে এবং ১২ই আগস্ট রাতে রূপসার শ্রীরামপুরে একটি ইটভাটার ভেতরে যুবদল কর্মী ফখরুল শেখকে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়।
এসব হত্যাকাণ্ডের প্রায় প্রতিটিতেই অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার এবং ভাড়াটে খুনিদের সরাসরি অংশগ্রহণ লক্ষ করা গেছে। বড় বহর নিয়ে অস্ত্রশস্ত্র হাতে ঘটনাস্থলে মহড়া দেওয়া এবং নির্বিঘ্নে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে নিরাপদে পালিয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা।
এ ধরনের নৃশংসতা প্রসঙ্গে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও কিশোর গ্যাংগুলোর মধ্যকার আধিপত্য বিস্তার, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এবং পুরোনো শত্রুতার জের ধরেই এসব খুনের ঘটনা ঘটছে।
চলতি বছরের ১লা জুন থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও মাদকবিরোধী যৌথ অভিযান চললেও পুলিশের নিজস্ব তথ্যদাতা বা ইনফরমার সংকট এবং সাধারণ মানুষের আস্থার অভাবে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসছে না।
পুলিশের নিজস্ব পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ছয় মাসে পুরো খুলনায় মোট ৩৭টি হত্যাকাণ্ডের রেকর্ড হয়েছে। যার মধ্যে নগরীতে ১৭টি এবং জেলার বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত হয়েছে ২০টি খুন।
এর আগে গত ৪ঠা মার্চ রাতে খুলনার ব্যস্ততম ডাকবাংলা মোড়ে রূপসা শ্রমিক দলের আহ্বায়ক মাসুম বিল্লাহকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে আগ্নেয়াস্ত্রসহ অপরাধীদের অনেকে শনাক্ত হলেও পুলিশ এখনও তাদের পাকড়াও করতে পারেনি।
১৯শে আগস্ট রাতে ঘটে যাওয়া লবণচরা আশিবিঘা এলাকার ভয়াবহ স্মৃতিচারণ করে নিহত নাজমুল শেখের বাবা মুনির শেখ বলেন, “মাত্র তিন ঘণ্টা আগে একই এলাকায় একটি খুনের ঘটনা ঘটল, অথচ এর পরেও পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর সক্রিয়তা দেখা যায়নি। এই সুযোগে সন্ত্রাসীরা পুনরায় এলাকায় ঢুকে আমার ছেলেকে গুলি করে হত্যা করে। কার কার কাছে অবৈধ অস্ত্র রয়েছে, তা সবাই জানে; কিন্তু আতঙ্কে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।”
উল্লেখ্য, গত ১৭ই জুন লবণচরা এলাকার এক মতবিনিময় সভায় পুলিশের কোনো সদস্য তথ্য ফাঁস করলে তাকে ‘ঝুলিয়ে পেটানোর’ হুঙ্কার দিয়েছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাশিদুল ইসলাম খান। এর পরদিন সকালেই তাকে পুলিশ সদর দপ্তরে প্রত্যাহার করা হয়।
খুলনা অঞ্চলে খুনাখুনি বেড়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে মেট্রোপলিটন পুলিশের ডেপুটি পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, পুলিশের গোপন ইনফরমারদের কাছ থেকে এখন আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
তবে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা, গোপন সংবাদের পরিসর বৃদ্ধি এবং তথ্যপ্রযুক্তির আধুনিক কলাকৌশল ব্যবহার করে অপরাধীদের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে, বিশিষ্ট অপরাধ বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম মনে করেন, সীমান্তবর্তী চোরাচালানের নিরাপদ রুট, গোপন অস্ত্র তৈরির কারখানা এবং বিগত সময়ের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগে থানা থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্রগুলো বর্তমানে সন্ত্রাসীদের হাতে পৌঁছে খুলনায় প্রবেশ করছে।
তবে পুলিশের কাছে তথ্য দিলে তা ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা, নিজেদের নিরাপত্তার অভাব এবং আস্থার তীব্র সংকটের কারণেই সাধারণ মানুষ আজ পুলিশের কাছে তথ্য দিতে পিছপা হচ্ছে।
