প্রকাশিতঃ সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬

লালন শাহ’র আখড়াবাড়ি, সংকট ও বাংলাদেশ সংবিধানের ১২, ২৩, ২৮, ৩১ এবং ৪১ অনুচ্ছেদ এর সরাসরি পরিপন্থী ভূমিকায় কুষ্টিয়ায় লালন একাডেমী।


লালন শাহ’র আখড়াবাড়ি, সংকট ও বাংলাদেশ সংবিধানের ১২, ২৩, ২৮, ৩১ এবং ৪১ অনুচ্ছেদ এর সরাসরি পরিপন্থী ভূমিকায় কুষ্টিয়ায় লালন একাডেমী।
\"মানুষ ধর্মের\" স্থপতি ফকির লালন শাহের আখড়া আজ বিভিন্ন সংকটে নিপতিত। লোকসংস্কৃতির এই প্রাণপুরুষ জাত-পাতের ঊর্ধ্বে গিয়ে \"মানুষ ভজো\"র বাণী দিয়েছেন। ইউনেস্কো যাকে মানবতার সম্পদ বলেছে। কিন্তু বাস্তবতায় আজ এখানে \'দেহ আছে আত্মা নাই\'। \"লালন একাডেমী\" মাজার প্রাঙ্গণে ওযুখানা ও নামাজের স্থান স্থাপন করায় ফকির সমাজ সহ বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। গত ২০ আগস্ট রওজার দক্ষিণ পাশে ট্যাপ কল লাগিয়ে ওযুর স্থান করা হয় এবং ১৯৮৫ সালে রওজার পশ্চিম বারান্দা লাগা পশ্চিমে টাইলস দ্বারা নির্মিত স্থানটি নামাজের স্থানের জন্য লালন একাডেমী নির্দ্ধারণ করে, যা ২০০৪ সালে পাকাপোক্ত করা হয়েছিল, কিন্তু ফকিরদের আপত্তিতে থেমে যায়। \"লালন মাজার শরীফ ও সেবাসদন\" কমিটিকে একাডেমী নিজ ঘরে পরবাসী করে রেখেছে। অথচ এরাই এই মাজারের প্রকৃত স্বত্বাধিকারী। এদের অভিযোগঃ আমাদের লালন লোকায়ত সাধনাকেন্দ্রকে ধীরে ধীরে কোন এক নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের কাঠামোয় বন্দি করার ‘অপসংস্কৃতির বাহুল্য, অপচর্চা ও অপচেষ্টা’ দীর্ঘদিন ধরে লালন একাডেমী সহ বিভিন্ন ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠী ও অন্যান্য মহলের পরিকল্পনা অব্যহত রয়েছে। এরই ক্রমধারায় আজ লালন আঁখড়ায় একাডেমির পৃষ্ঠপোষকতায় অযুর স্থান নির্মাণ করা হয়েছে। অথচ মাজার থেকে ৫ মিনিটের দূরত্বে দুটি মসজিদ রয়েছে। লালনের আখড়ার বিষয় গুরু-শিষ্যের সাধনা ও তত্ত্বালাপ। ওযু-নামাজের স্থাপনা বাড়লে \"খাঁচা থাকবে, পাখি থাকবে না\"। ১৮৯০ সাল থেকে ফকির পরম্পরাই লালন মাজার শরীফ ও সেবাসদন কমিটি এই আখড়ার মূল ধারক। তাদেরকে বাদ দিয়ে লালন একাডেমীর অনধীকার মূলক পরিচালনা মানে ফকির ছাড়া লালন ব্যবসা। মাজার কমিটিকে বাহিরে রেখে তাদেরই ধর্মালয়ে অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে, তাদেরই প্রণামির অর্থ ও সংস্কৃতিকে লুটে নিয়ে প্রায় ৪১ বছর লালন একাডেমী কিছু ভুখানাঙ্গা ফকির আর কিছু নারী নাচনিওয়ালা নিয়ে এহেন অপসংস্কৃতির বলয় গড়ে তুলেছে। গড়ে তুলেছে নিরাপদ প্রমদ বিলাশ খানা ও রাষ্ট্রীয় অতিথিদের আপ্যায়নশালা। হয়তো একদিন এই মহান স্থানটি রিসোর্টে পরিনত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাই এখানে ফকির না থাকলে বাংলাদেশ তার সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক ব্র্যান্ড (অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদ দর্শন) হারাবে। ফকির সমাজের দাবি, লালন মাজার ও সেবাসদন কমিটির নেতৃত্বে মাজার পরিচালনা করতে হবে। রওজায় লালন মাজার শরীফ ও সেবাসদন কমিটি খাদেম নিয়োগ দিবে। লালনীয় সংস্কৃতি পরিচালনা করবে। একাডেমী থাকবে প্রচার-প্রসার ও গবেষণায়। প্রয়োজনে একাডেমীর জমিতে আলাদা নামাজের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রতীককে (লালন মাজার) বাঁচাতে হলে সংবিধান ও ২০০ বছরের ঐতিহ্যকে সম্মান জানাতেই হবে। নইলে \"মানুষ ভজে সোনার মানুষ\" হওয়ার এই সত্যটিই হারিয়ে যাবে হয়তো একদিন। ইউনেস্কো যাকে \"মানবতার অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য\" বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। পৃথিবী যখন শান্তি ও সহিষ্ণুতার মডেল হিসেবে লালনকে পড়ছে। যখন Indiana University, Syracuse University সহ আরও অন্যান্য University তে লালনের উপর PhD হচ্ছে। তখন যদি বিদেশি গবেষকরা এসে দেখেন যে, এখানে সাধনা নেই, ফকির নেই, শুধু ফাকরা ও মেলা বাণিজ্য আছে, তবে বাংলাদেশ তার সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক রপ্তানি দর্শনটিকে (অসাম্প্রদায়িক দর্শন) হারাতে পারে। লালন মাজার শরীফ ও সেবাসদন কমিটির সভাপতি মোঃ আহসান আলী তুফানকে এ বিষয়ে তার পতিক্রীয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন আমাদের মূল আদর্শ \"মানুষ ধর্ম\"। আমরা নামাজ-পূজা বা কোন উপাসনার বিরোধী নই, তবে এখানে ওযু-নামাজের ব্যবস্থা বাড়লে আখড়াটি একটি নির্দিষ্ট ধর্মের উপাসনালয়ে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা করি। আশঙ্কা করি ভাব ও সাধনার অবলুপ্ততা নিয়ে। লালন সাঁইজী ছিলেন আশ্রমিক সাধক। গুরু-শিষ্য পরম্পরা, দেহতত্ত্ব ও আত্মতত্ত্বের পাঠশালা, আর্কাইভ, অতিথিশালা এখানে আজও গড়ে ওঠেনি। এগুলোর অভাবে নতুন প্রজন্ম একদিন লালনকে জানবে হয়তো পুরনো আর সব গাহকের মতো, একজন পথ ফকির হিসেবে বা প্রচলিত ধর্মের একজন সমালোচক হিসেবে বা তথাকথিত গবেষকদের শুধু গবেষণার উপাদান হিসেবে। যাতে দামী হওয়া যায়, দর্শনকে নিয়ে নয়! এতে ভবিষ্যতে লালনীয় পথ হারাতে পারে জাতি ও দেশ। আরও বিলুপ্তি হতে পারে ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতা। তিনি আরও বলেন লালন একাডেমীর এহেন অপচর্চা ও আচরণ বাংলাদেশ সংবিধানের সম্পূর্ণ ১২, ২৩, ২৮, ৩১ এবং ৪১ অনুচ্ছেদ এর সরাসরি পরিপন্থী আচরণ। যা আইন আন্দোলন এবং সংঘাতের দিকে ক্রমান্বয়ে ঠেলে দিচ্ছে। এরা লুটেরা, স্বার্থবাদী। এরা প্রকৃতার্থে কোন ধর্মে বিশ্বাসী নয়, ধর্মাশ্রয়ী মাত্র। এতে এদের কোন কালেই মাথা ব্যথা ছিলনা, কোনদিন থাকেবে না। সুচৈতন্যের প্রয়োজনে প্রকৃতির পক্ষ থেকে এদের জন্য বিশেষতঃ পালশে মাদার ডালের শক্ত প্রয়োগ অতি আবশ্যক। এরা সারাকাল সত্যের বিরুদ্ধচারী, অশান্তিতে রেখেছে গোটা বিশ্ব মানুষকে। মনে রাখা প্রয়োজন \"Nature takes revenge on every interference by means of human strength\"