ডিএনএ পরীক্ষায় প্রমাণিত: ধর্ষণে অন্তঃসত্ত্বা হওয়া ১১ বছরের শিশুর গর্ভে জন্ম নেয়া সন্তানের জৈবিক পিতা মাদ্রাসাশিক্ষকই
অনলাইন নিউজ ডেক্স
নেত্রকোণার মদন উপজেলায় মাদ্রাসাশিক্ষকের ধর্ষণে ১১ বছর বয়সী এক শিশুরঅন্তঃসত্ত্বা হওয়ার আলোচিত ঘটনায় অবশেষে ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে। প্রতিবেদনে নিশ্চিত হয়েছে, অভিযুক্ত মাদ্রাসাশিক্ষক আমান উল্লাহ মাহমুদী সাগরই ওই শিশুর গর্ভে থাকা সন্তানের জৈবিক পিতা।
যেভাবে ঘটনার শুরু
মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত বছরের ২ অক্টোবর বিকেলে ক্লাস শেষ হওয়ার পর অভিযুক্ত শিক্ষক শিশুটিকে মাদ্রাসা সংলগ্ন মসজিদে ঝাড়ু দিতে বলেন এবং পরবর্তীতে তাকে নিজের কক্ষে ডেকে ধর্ষণ করেন। দীর্ঘদিন বিষয়টি অগোচরে থাকার পর চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল শিশুটির মা মেয়ের শারীরিক পরিবর্তন লক্ষ করে স্থানীয় একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যান, যেখানে চিকিৎসক জানান শিশুটি অন্তঃসত্ত্বা। এরপর ২৩ এপ্রিল অভিযুক্ত শিক্ষকসহ দুইজনের বিরুদ্ধে মদন থানায় ধর্ষণ মামলা করেন শিশুটির মা।
অভিযোগ অস্বীকার, সামাজিক মাধ্যমে সমর্থনের ঢল
গ্রেপ্তারের আগে অভিযুক্ত শিক্ষক আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। এই দাবির প্রেক্ষিতে তার সমর্থনে হাজারো মাদ্রাসাছাত্রের আইডি ও কিছু সামাজিক মাধ্যম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব সরব হয়ে ওঠেন, যা ঘটনাটিকে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় নিয়ে আসে।
১১ বছরের শিশু অন্তঃসঅত্ত্বা হবার ঘটনা ও মাদ্রাসা শিক্ষকের প্রতি অভিযোগ করায় প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছিলেন নারী চিকিৎসক,
অভিযুক্তের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল শত শত ইসলামপন্থী ও প্রভাবশালী অনলাইন ব্যক্তিত্ব
পুলিশ গ্রেপ্তারের পর আদালতে হাজির করা হলে অভিযুক্ত শিক্ষক দোষ স্বীকার করেননি। তিন দিনের রিমান্ড শেষে তাকে ফের আদালতে হাজির করে পুলিশ ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন জানায়, যা আদালত মঞ্জুর করেন।
ডিএনএ প্রতিবেদন: অভিযুক্তই শিশুর বাবা
আদালতের নির্দেশে গত ২৮ জুলাই সিলেটের একটি সেফহোমে গিয়ে ঢাকার সিআইডি ল্যাবের একটি প্রতিনিধিদল নবজাতকের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে। সম্প্রতি সেই প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপিত হয়েছে। মামলার পাবলিক প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদনে অভিযুক্ত মাদ্রাসাশিক্ষক আমান উল্লাহ মাহমুদী সাগরই নবজাতকের জৈবিক পিতা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে মামলাটির বিচারকাজ শেষ করা সম্ভব হবে।
সত্য প্রকাশ করায় চিকিৎসকের ওপর নেমে আসে হুমকি
শিশুটির অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়টি প্রথম শনাক্ত করেছিলেন গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. সায়মা আক্তার। তিনিই প্রথম সামনে আনেন যে শিক্ষকের ধর্ষণের ফলে ১১ বছরের ওই মাদ্রাসা ছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে। এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই তিনি হয়রানি ও হুমকির শিকার হতে থাকেন। তাকে হত্যা ও ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে মদন থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে বাধ্য হন তিনি।
ডা. সায়মা আক্তার নিজেই এক ভিডিও বার্তায় জানান, সত্য প্রকাশের পর থেকে তাকে অনলাইনে অশালীন মন্তব্য, সাইবার বুলিং এমনকি প্রাণনাশের হুমকির শিকার হতে হচ্ছে। অভিযুক্ত শিক্ষক রিমান্ডে যাওয়ার পরও দফায় দফায় তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া অব্যাহত থাকে। নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত এই চিকিৎসক থানায় জিডি করে প্রশাসনের কাছে সুরক্ষা চেয়েছেন।
একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা
এই ঘটনা একটি ভয়ংকর প্রবণতাকে সামনে নিয়ে আসে— মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যাবস্থা ধর্ষন আর বলৎকারের আখড়া হয়ে উঠছে। আরও যেটা ভয়ংকর বিষয়, সেটা হচ্ছে, শুধু মাত্র দাড়ি টুপি আর ইসলামী লেবাস দেখে এদের নির্দোষ ভেবে হাজার হাজার মানুষ হুজুরদের পক্ষে দাড়িয়ে যাচ্ছে। শিশু ধর্ষণের মতো অপরাধেও অভিযুক্তের পক্ষে সংগঠিতভাবে সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা চালানো, এবং সত্য তুলে ধরা পেশাজীবীকে (এক্ষেত্রে একজন নারী চিকিৎসক) হুমকি দিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। ডিএনএ পরীক্ষার বৈজ্ঞানিক প্রমাণে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হওয়ার পর, যারা অভিযুক্তকে নির্দোষ দাবি করে প্রচারণা চালিয়েছিলেন তাদের অবস্থান নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে।
