মস্কোয় পুতিন-লাভরভের সঙ্গে জয়শঙ্করের বৈঠক: ভারত-রাশিয়া কৌশলগত সম্পর্কে নতুন গতি
অনলাইন নিউজ ডেক্স
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর দুই দিনের রাশিয়া সফরে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে পৃথক পৃথক বৈঠক করেছেন। এই বৈঠকগুলো এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে এবং আগামী মাসগুলোতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বহুপাক্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে—ফলে এই সফরকে কূটনৈতিক মহল যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে।
বাণিজ্য কমিশনের বৈঠকে সভাপতিত্ব
২৩-২৪ আগস্ট রাশিয়া সফরকালে জয়শঙ্কর রুশ প্রথম উপ-প্রধানমন্ত্রী দেনিস মান্তুরভের সঙ্গে যৌথভাবে বাণিজ্য, অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিগত ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বিষয়ক ভারত-রাশিয়া আন্তঃসরকার কমিশনের ২৭তম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। এই কমিশন দুই দেশের মধ্যে বহুমুখী ক্ষেত্রে সহযোগিতা পর্যালোচনা ও সম্প্রসারণের অন্যতম প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
লাভরভের সঙ্গে বৈঠক: আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে মতবিনিময়
রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিবৃতি অনুযায়ী, লাভরভ ও জয়শঙ্করের মধ্যকার আলোচনায় সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফগানিস্তানের পরিস্থিতি, ইরান-সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং ইউক্রেন সংকট নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন। তাঁরা জাতিসংঘ, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও), ব্রিকস এবং জি-২০-এর মতো বহুপাক্ষিক মঞ্চে নিজেদের অবস্থান ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। উভয় পক্ষ সব স্তরে আস্থাভিত্তিক সংলাপ জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একমত হয়।
ক্রেমলিনে পুতিনের সঙ্গে বৈঠক
সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ক্রেমলিনে প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে জয়শঙ্করের সাক্ষাৎ। এই বৈঠকে জয়শঙ্কর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শুভেচ্ছা পৌঁছে দেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে একটি ব্যক্তিগত বার্তা পুতিনের হাতে তুলে দেন। তিনি পুতিনকে দিনের শুরুতে অনুষ্ঠিত আন্তঃসরকার কমিশনের বৈঠকের ফলাফল সম্পর্কে অবহিত করেন এবং দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি তুলে ধরেন।
জয়শঙ্কর জানান, প্রধানমন্ত্রী মোদি আসন্ন এসসিও শীর্ষ সম্মেলনে পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাতের অপেক্ষায় আছেন এবং আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে তাঁকে স্বাগত জানানোর জন্যও অপেক্ষা করছেন। পুতিন তাঁর বক্তব্যে বলেন, জয়শঙ্করের এই সফর কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের গভীরতাকেই প্রতিফলিত করে।
কেন এই বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরের তাৎপর্য কয়েকটি দিক থেকে বিবেচনা করা যায়।
প্রথমত, এটি নিছক একটি বাণিজ্যিক কমিশন বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না—পুতিন ও লাভরভ উভয়ের সঙ্গে পৃথক বৈঠক এই সফরকে রাজনৈতিক ও কৌশলগত পর্যায়ে উন্নীত করেছে, যা ভারত-রাশিয়া “বিশেষ ও সুবিধাপ্রাপ্ত কৌশলগত অংশীদারত্ব”-এর ধারাবাহিকতাকে তুলে ধরে।
দ্বিতীয়ত, আফগানিস্তান, ইরান ও ইউক্রেন নিয়ে মতবিনিময় এমন এক সময়ে হলো, যখন দক্ষিণ ও পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল। এই আলোচনা দেখায় যে, দুই দেশ শুধু দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্কেই নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রশ্নেও একে অপরের দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় রাখতে চায়।
তৃতীয়ত, জাতিসংঘ, এসসিও, ব্রিকস ও জি-২০-এর মতো বহুপাক্ষিক মঞ্চে অবস্থান সমন্বয়ের অঙ্গীকার একটি বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার প্রতি উভয় দেশের অভিন্ন আগ্রহকেই প্রতিফলিত করে, যা পশ্চিমা-কেন্দ্রিক বৈশ্বিক শাসনকাঠামোর বাইরে বিকল্প কূটনৈতিক জোট গঠনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা যায়।
চতুর্থত, এই সফর আসন্ন এসসিও শীর্ষ সম্মেলন ও সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তুতিপর্ব হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। পুতিনের কাছে মোদির ব্যক্তিগত বার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং শীর্ষ সম্মেলনগুলোতে সরাসরি সাক্ষাতের প্রত্যাশা ব্যক্ত করা থেকে বোঝা যায়, দুই নেতার মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ অব্যাহত রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, জয়শঙ্করের এই মস্কো সফর এবং পুতিন-লাভরভের সঙ্গে তাঁর বৈঠক ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের বহুমাত্রিক প্রকৃতি—অর্থনৈতিক সহযোগিতা, কৌশলগত সংলাপ ও বহুপাক্ষিক সমন্বয়—এর একটি সমন্বিত প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও দুই দেশের সম্পর্কের স্থিতিস্থাপকতা তুলে ধরে।
