প্রকাশিতঃ সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬

যেসব বিষয় নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা নিষিদ্ধ


যেসব বিষয় নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা নিষিদ্ধ

আল্লাহ তাআলা মানুষকে পরম মমতায় সৃষ্টি করেছেন এবং সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সম্মানিত করেছেন। মানুষের আত্মসম্মানবোধ ও মর্যাদা রক্ষা করা ইসলামের অন্যতম মৌলিক নির্দেশ। কিন্তু বর্তমান সমাজে নিছক বিনোদন বা হাসাহাসির নামে অন্যকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা এক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। মুখ থেকে বের হওয়া সামান্য কৌতুকও অনেক সময় অন্যের অন্তরে গভীর ক্ষত তৈরি করে। ইসলাম কৌতুককে সম্পূর্ণ নিষেধ করেনি, তবে অন্যের মনঃকষ্টের কারণ হয় বা শরিয়তের সীমা লঙ্ঘন করে— এমন যেকোনো ঠাট্টা-বিদ্রূপকে কঠোরভাবে হারাম ঘোষণা করেছে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা মানুষের মর্যাদার ঘোষণা দিয়ে বলেন—

وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ

‘আর আমি তো আদমসন্তানকে সম্মানিত করেছি এবং স্থলে ও সমুদ্রে তাদের চলাচলের ব্যবস্থা করেছি।’ (সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ৭০)

মানুষকে নিয়ে ঠাট্টা করা সম্পর্কে সতর্ক করে আল্লাহ তাআলা আরও নির্দেশ দিয়েছেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِّن قَوْمٍ عَسَىٰ أَن يَكُونُوا خَيْرًا مِّنْهُمْ وَلَا نِسَاءٌ مِّن نِّسَاءٍ عَسَىٰ أَن يَكُونَّ خَيْرًا مِّنْهُنَّ

‘হে মুমিনগণ, কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রূপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর নারীরাও যেন অন্য নারীদের ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রূপকারীদের চেয়ে উত্তম।’ (সুরা আল-হুজুরাত: আয়াত ১১)

যেসব নির্দিষ্ট বিষয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম, নিচে তা বিস্তারিত তুলে ধরা হলো—

১. দ্বীন ও ধর্মীয় বিষয় নিয়ে ঠাট্টা করা

আল্লাহ, পবিত্র কুরআন, রাসুলুল্লাহ (সা.), সুন্নাত কিংবা ইসলামের যেকোনো বিধান নিয়ে বিদ্রূপ বা উপহাস করা কবিরা গুনাহ এবং এর ফলে মানুষের ইমান নষ্ট হয়ে যায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেন—

وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ ۚ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ ۝ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ

‘আর তুমি যদি তাদের জিজ্ঞাসা কর, তবে তারা অবশ্যই বলবে, আমরা তো কেবল আলাপ-আলোচনা ও খেলাধুলা (রসিকতা) করছিলাম। বল, তোমরা কি আল্লাহ, তার আয়াতসমূহ ও তার রাসুলকে নিয়ে ঠাট্টা করছিলে? তোমরা অজুহাত পেশ কর না, তোমরা তো ইমান আনার পর কুফরি করেছ।’ (সুরা আত-তওবা: আয়াত ৬৫-৬৬)

২. কারও শারীরিক গঠন বা ত্রুটি নিয়ে উপহাস করা

কারও উচ্চতা, গায়ের রং, অন্ধত্ব, খাটো হওয়া কিংবা কোনো শারীরিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে কৌতুক করা সৃষ্টি কর্তার সৃষ্টিকে অপমান করার শামিল। এতে আক্রান্ত ব্যক্তি মানসিকভাবে চরম ব্যথিত হন।

হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি একবার হজরত সাফিয়া (রা.)-এর খাটো হওয়ার প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করে ইঙ্গিত করেছিলেন। তা দেখে রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে বলেন—

لَقَدْ قُلْتِ كَلِمَةً لَوْ مُزِجَتْ بِمَاءِ الْبَحْرِ لَمَزَجَتْهُ

‘তুমি এমন একটি কথা বলেছ, তা যদি সমুদ্রের পানির সঙ্গেও মিশিয়ে দেওয়া হতো, তবে তা সমুদ্রের পানিকে বিষাক্ত/দূষিত করে ফেলত।’ (তিরমিজি ২৫০২)

৩. বিকৃত বা মন্দ নামে ডাকা

কারও নাম বিকৃত করা বা অপছন্দনীয় উপাধিতে ডাকা সমাজে ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। অথচ ইমানদার মানুষের জন্য কারও মন্দ নামকরণ বা ব্যঙ্গ করা স্পষ্ট হারাম। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন—

وَلَا تَلْمِزُوا أَنفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ ۖ بِئْسَ الِاسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيمَانِ ۚ وَمَن لَّمْ يَتُبْ فَأُولَٰئِك هُمُ الظَّالِمُونَ

‘তোমরা একে অপরের নিন্দা কর না এবং একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। ইমান আনার পর মন্দ নামে ডাকা কতই না নিকৃষ্ট! আর যারা তওবা না করে, তারাই তো জালিম।’ (সুরা আল-হুজুরাত: আয়াত ১১)

৪. কারও ভুল, বিপদ বা অতীতের গুনাহ নিয়ে খোঁটা দেওয়া

মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে কিংবা যেকোনো সময় বিপদে পড়তে পারে। কারও ব্যর্থতা, বিপদ কিংবা অতীতের শুধরে নেওয়া গুনাহ নিয়ে হাসাহাসি করা বা খোঁটা দেওয়া চরম অমানবিক ও গুনাহের কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন—

لاَ تُظْهِرِ الشَّمَاتَةَ لأَخِيكَ فَيَرْحَمَهُ اللَّهُ وَيَبْتَلِيَكَ

‘তুমি তোমার ভাইয়ের বিপদে আনন্দ প্রকাশ কর না। তা করলে আল্লাহ তার ওপর দয়া করবেন এবং তোমাকে সেই বিপদে নিক্ষিপ্ত করবেন।’ (তিরমিজি ২৫০৬)

৫. দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক অবস্থা বা অসংগতি নিয়ে ঠাট্টা করা

কারও ছিঁড়ে যাওয়া পোশাক, কম দামি জিনিসপত্র, সাধারণ জীবনযাত্রা কিংবা আর্থিক অনটন নিয়ে ঠাট্টা করা মারাত্মক অপরাধ। কোনো মানুষের পরিচয় তার সম্পদে নয়, বরং তার তাকওয়ায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—

بِحَسْبِ امْرِئٍ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ

‘কোনো মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ বা হিংসা করে।’ (মুসলিম ২৫৬৪)

রসিকতায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাত

ইসলাম জীবনকে একেবারে নিরস বা কঠোর করে তোলে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে সাহাবিদের সঙ্গে আনন্দ-কৌতুক ও রসালাপ করতেন, কিন্তু তার কৌতুকের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল— তাতে কোনো মিথ্যা, অন্যায় বা কারও প্রতি অপমান থাকত না। হাদিসে পাকে এসেছে, সাহাবিগণ জিজ্ঞাসা করলেন— ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনিও আমাদের সঙ্গে কৌতুক করেন? তিনি বললেন—

إِنِّي لاَ أَقُولُ إِلاَّ حَقًّا

‘হ্যাঁ, তবে আমি সত্য বৈ অন্য কিছু বলি না।’ (তিরমিজি ১৯৯০)

হাসি-ঠাট্টা জীবনের আনন্দের খোরাক হলেও যখন তা কারও আত্মসম্মানে আঘাত হানে কিংবা শরিয়তের সীমালঙ্ঘন করে, তখন তা কবিরা গুনাহে পরিণত হয়। অন্যের শারীরিক গঠন, দারিদ্র্য, ভুলত্রুটি বা দ্বীনের অনুশাসন নিয়ে ঠাট্টা করা থেকে জবানকে সংযত রাখা অপরিহার্য। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো সুন্নাত অনুসরণে সত্য ও শালীনতার গণ্ডির মধ্যে থেকে পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি করাই একজন সচেতন মুমিনের পরিচয়।

সর্বশেষ :