প্রকাশিতঃ সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬

হামের প্রাদুর্ভাবে মৃত্যু হাজারের ঘরে


হামের প্রাদুর্ভাবে মৃত্যু হাজারের ঘরে
হামের উপসর্গ নিয়ে বরিশাল ও সিলেট বিভাগে আরও দুজনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এ বছর হাম ও হামের উপসর্গে প্রাণহানির সংখ্যা ৯৯৯ জনে গিয়ে ঠেকেছে। সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দুজনের মৃত্যুর পর আজ সকালে পাঠক যখন প্রতিবেদনটি পড়ছেন তখন হয়তো মৃত্যুর সংখ্যা হাজারের ঘর ছাড়িয়ে যাবে। ২৪ ঘণ্টায় ৭৯ জনের হাম এবং এক হাজার ১৫৭ জনের শরীরে হাম উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত ১৫ মার্চ থেকে হামের তথ্য প্রকাশ করে আসছে। দপ্তরটির তথ্য অনুযায়ী, হামে আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে এ পর্যন্ত ১০০ জন মারা গেছে। হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছে ৮৯৯ জন। হামে বেশি মৃত্যু ঢাকা বিভাগে ৬৩ জন। এর পর বরিশাল বিভাগে ১৯ জন। হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৪০৩ জন মারা গেছে ঢাকা বিভাগে। এর পরই সিলেট বিভাগ, সেখানে মারা গেছে ১৫৬ জন। এছাড়া রাজশাহীতে ৯২, ময়মনসিংহে ৭৫, চট্টগ্রামে ৬৫, বরিশালে ৫৭, খুলনায় ৩৭ ও রংপুর বিভাগে ১৪ জন মারা গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এক হাজার ৮৯ জন। ঢাকা বিভাগে ভর্তি ৩৬৬ জন, রাজশাহীতে ২৭, সিলেটে ১৪০, চট্টগ্রামে ২৫৬, বরিশালে ১২৫, ময়মনসিংহে ৭৫, খুলনায় ৮০, রংপুরে ২০ জন। এ নিয়ে সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে রোগী ভর্তির সংখ্যা দাঁড়াল এক লাখ ৪৬ হাজার ৩৫৯। তাদের মধ্যে এক লাখ ৪০ হাজার ৮৫০ জন হাসপাতাল ছেড়েছে। আর উপসর্গযুক্ত (সন্দেহজন হাম) রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৬৬ হাজার ৪৬১। আর হাম শনাক্ত হয়েছে ১৯ হাজার ৮৩৫ জনের। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, টিকা দেওয়ার পরও প্রতিদিন হামে এক হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে এবং ঘটছে মৃত্যুও। মূলত চারটি বড় ভুলে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হয়েছে। এগুলো হলো-২০২৪ সালে হাম-রুবেলার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি না করা, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়মিত টিকাদানে গাফিলতি, চলতি বছরে ব্যাপক সংক্রমণের পরও হামকে জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা না করে গতানুগতিক পদ্ধতিতে পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং সর্বশেষ বিশেষ গণটিকা কর্মসূচিতে প্রায় ৪০ লাখ শিশু বাদ পড়ে যাওয়া। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও পরামর্শক ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, শুধু টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নিলেই সংক্রমণ ও মৃত্যু নিয়ন্ত্রণে আসবে না; টিকা কার্যক্রমকে আরও সুনির্দিষ্ট ও বৈজ্ঞানিকভাবে পরিচালনা করতে হবে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় টিকাদান কম হয়েছে, সেসব এলাকার শিশুদের তালিকা করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। পাশাপাশি টিকাকেন্দ্র মানুষের বাড়ির কাছাকাছি নিয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত টিকাদান শুরু করা প্রয়োজন ছিল, সরকার সেটি করেছে। তবে এরপর মাইক্রোপ্ল্যানিং করে বাদ পড়া জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনার কাজটিও জরুরি। বিশেষ করে পাঁচ থেকে ১৫ বছর বয়সি শিশুদের বড় অংশকে টিকার আওতায় আনা গেলে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার কমানো সম্ভব হবে। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, উদ্বেগজনক প্রাদুর্ভাবের মধ্যে সরকার এপ্রিলে দেশব্যাপী হামের টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করে; কিন্তু এই কর্মসূচি পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করেছে কি না, তার মূল্যায়ন কয়েক মাস ধরে করা হয়নি। চিকিৎসকরা এমন রোগীও পাচ্ছেন যারা টিকা নেননি এবং কেউ কেউ টিকা নেওয়ার পরও সংক্রমিত হচ্ছেন। শিশুরা জন্মগতভাবে মা থেকে বুকের দুধ পানের মাধ্যমে হামের বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিয়ে জন্মায়। যেটি ৯ মাস পর্যন্ত শরীরে কার্যকর থাকে। কিন্তু অনেক শিশু ৯ মাসের আগেই আক্রান্ত হচ্ছে। যা বেশি উদ্বেগের। হামের দীর্ঘমেয়াদি প্রকোপ ও প্রার্দুভাব কমাতে হলে শিশুদের পাশাপাশি গর্ভধারণে ইচ্ছুক এমন মায়েদেরও টিকার আওতায় আনতে হবে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় ২০০৬ সালে হাম-রুবেলার (এমআর ভ্যাকসিন) টিকার ক্যাম্পেইন শুরু হয়। এরপর ২০১০, ২০১৪ ও ২০২০ সালের (২০২০ সালের ডিসেম্বরে শুরু হয়ে পরের মাস জানুয়ারিতে শেষ) ক্যাম্পেইন হয়। মাতৃ, নবজাতক, শিশু ও কিশোর স্বাস্থ্যবিষয়ক অপারেশনাল প্ল্যানের আওতায় সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) পরিচালিত হতো। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর এক সভায় সিদ্ধান্ত হয়, নিয়মিত ইপিআইয়ের সব টিকার খরচ উন্নয়ন বাজেটের পরিবর্তে রাজস্ব বাজেট থেকে খরচ করা হবে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই সেক্টর কর্মসূচি পুরোপুরি বাদ দিয়ে প্রায় সবকিছু রাজস্ব খাতে আনার চেষ্টা করে। ফলে নির্ধারিত সময়ে টিকা ক্রয় ও শিশুদের টিকাদানে ভাটা পড়ে। সর্বশেষ বিশেষ ক্যাম্পেইন হয় গত ২০ এপ্রিল থেকে ২০ মে সময়ে; যদিও তা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে হওয়ার কথা ছিল। এ বছরের শুরু থেকে হামের প্রকোপ দেখা দেয়। মার্চের মাঝামাঝি ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে। বাড়তে থাকে মৃত্যুও। যাদের বেশির ভাগই শিশু। সংক্রমণ রোধে বর্তমান সরকার প্রথমে ৫ এপ্রিল ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে স্বাস্থ্য বিভাগ। পরে ৮ এপ্রিল ঢাকার দুটি এবং বরিশাল ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন এবং ২০ এপ্রিল থেকে তা সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দাবি, হামের টিকাদানের আওতা লক্ষ্যমাত্রার ১০৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এদিকে আগস্ট মাসেও হামে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বেশি ছিল।