গ্যাস-বিদ্যুতে ভর্তুকির হিসাব মিলছে না, ২ মাসেই উধাও বরাদ্দের ৬০ ভাগ অর্থ
অনলাইন নিউজ ডেক্স
চলতি অর্থবছরের শুরুতেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভর্তুকি নিয়ে চরম চাপে পড়েছে দেশের অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দরপতন-উত্থান এবং অতিরিক্ত খরচের কারণে অর্থ বছরের প্রথম দুই মাসেই (জুলাই ও আগস্ট) ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ রাখা বাজেটের প্রায় ৬০ শতাংশ অর্থ ইতোমধ্যে ছাড় করতে হয়েছে।
ফলে অর্থবছরের বাকি ১০ মাস কীভাবে পরিচালিত হবে—তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বরাদ্দ ও ব্যয়ের পরিসংখ্যান
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও এলএনজি খাতে ভর্তুকি বাবদ মোট ৪৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। কিন্তু জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসেই সরকার ইতোমধ্যে ছাড় করেছে ২৬ হাজার কোটি টাকা।
খাত
বার্ষিক মোট বাজেট বরাদ্দ
২ মাসে ছাড়কৃত অর্থ
অবশিষ্ট বাজেট বরাদ্দ
বিদ্যুৎ খাত
৩৭,০০০ কোটি টাকা
১৫,০০০ কোটি টাকা
২২,০০০ কোটি টাকা
এলএনজি খাত
৬,০০০ কোটি টাকা
১১,০০০ কোটি টাকা
-৫,০০০ কোটি টাকা (ঘাটতি)
মোট
৪৮,০০০ কোটি টাকা
২৬,০০০ কোটি টাকা
২২,০০০ কোটি টাকা
বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের চিত্র
উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের বড় ব্যবধানের কারণে বিদ্যুৎ খাতে প্রতি বছরই বিশাল অঙ্কের টাকা ভর্তুকি দিতে হয়। গত ২১শে সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ বিভাগের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড় করা হয়, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ৯৪টি কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার বকেয়া মেটাতে ব্যয় হবে।
সব মিলিয়ে দুই মাসে ছাড় হয়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা।
সবচেয়ে নাজুক অবস্থা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) খাতে।
এই খাতে সারা বছরের জন্য মাত্র ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও প্রথম দুই মাসেই বিশ্ববাজার থেকে চড়া দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে গিয়ে খরচ হয়েছে ১১ হাজার কোটি টাকা।
ফলে অর্থ বছরের শুরুতে এই এক খাতেই অতিরিক্ত ৫ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে খোলা বাজার থেকে বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে সরকারকে।
আইএমএফের চাপ ও উভয়সংকট
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভর্তুকি কমানোর জন্য ধারাবাহিক চাপ দিয়ে আসছে।
অন্যদিকে, বিশ্ববাজারের অস্থিরতায় হঠাৎ ভর্তুকি উঠিয়ে দিলে বা দাম বাড়ালে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর চাপ বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদনে।
ভর্তুকি বরাদ্দ ও ২ মাসের খরচের তুলনা (কোটি টাকায়)
৫০,০০০ ┌────────────────────────────────────────────────────────┐
│ ৪৮,০০০ (মোট বাজেট) │
৪০,০০০ ├────────────────────────────────────────────────────────┤
│ │
৩০,০০০ ├────────────────────────── ২৬,০০০ (২ মাসে ব্যয়) │
│ │
২০,০০০ ├────────────────────────────────────────────────────────┤
০ └────────────────────────────────────────────────────────┘
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও সমাধান
অর্থনীতিবিদ শাহ মো. আহসান হাবিবের মতে, কেবল বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে বা ভর্তুকি শূন্য করে এ সমস্যার টেকসই সমাধান হবে না। কারণ নিম্ন আয়ের মানুষ, কৃষি এবং শিল্পের নিরাপত্তার স্বার্থে ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, সমস্যার আসল মূল লুকিয়ে রয়েছে পদ্ধতিগত দুর্নীতি ও সিস্টেম লসের ভেতরে। ভর্তুকি নিয়ে টানাহেঁচড়া না করে বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থার অপচয় ও ৫০-৬০ টাকার দুর্নীতি বন্ধ করতে পারলে বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় সম্ভব।
একই সাথে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ও বিতরণ ব্যবস্থার নিরপেক্ষ নিরীক্ষার মাধ্যমে সঠিক খরচ নির্ধারণ এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা এখন সময়ের দাবি।
সূত্র: একাত্তর টিভি
