হুথিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন সমঝোতা: মার্কিন জাহাজকে বাধা না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি
অনলাইন নিউজ ডেক্স
মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে, ওয়াশিংটন যদি সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষে সরাসরি সামরিক অভিযানে না জড়ায়, তাহলে তারা লোহিত সাগরে মার্কিন জাহাজ চলাচলে কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না। ট্রাম্প প্রশাসন ২০২৫ সালের মার্চে হুথিদের একটি বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করলেও পরবর্তীতে তাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যায় এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে হুথি হামলা বন্ধে দুই মাসের মার্কিন হামলার পর ২০২৫ সালের মে মাসে একটি যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছায়।
রয়টার্সের বরাত দিয়ে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হুথিদের সাম্প্রতিক আক্রমণাত্মক অভিযানের কয়েকদিন পরই মার্কিন কর্মকর্তারা ওমানে হুথি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। গত রোববার ওমানের রাজধানী মাস্কাটে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে হুথিরা মার্কিন কর্মকর্তাদের জানায় যে তারা ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে অটল রয়েছে এবং মার্কিন জাহাজে হামলার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, বৈঠকে হুথিরা বলেছে তারা মার্কিন জাহাজে হামলা চালানোর ইচ্ছা রাখে না এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ২০২৫ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে চলবে। এছাড়া হুথি প্রতিনিধিরা জোর দিয়ে বলেছেন, সৌদি ও ইয়েমেন সরকারের মধ্যে পুনরায় শুরু হওয়া লড়াইয়ের অংশ হিসেবে তাদের হামলা কেবল সৌদি জাহাজকে লক্ষ্য করেই পরিচালিত হয়েছিল, এবং তারা বাব এল-মান্দেব প্রণালী দিয়ে অন্য সব জাহাজের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এই আলোচনার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে হুথিদের সাম্প্রতিক ভূখণ্ডগত অগ্রগতির মধ্য দিয়ে। হুথিরা সম্প্রতি ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূলের কার্যত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে মোখা বন্দর এবং বাব এল-মান্দেব প্রণালীর পেরিম দ্বীপ। এই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথটির ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হওয়ায় তেল রপ্তানি আরও বিপর্যস্ত হতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতে ইরানকে নতুন কূটনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা এনে দিতে পারে।
গত জুলাই মাস থেকে পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের মধ্যে জুলাই মাসে হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ নৌ-অবরোধ ঘোষণা করে এবং বাব এল-মান্দেব প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী সৌদি সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা শুরু করে। এরপর গত বৃহস্পতিবার হুথিরা মোখা বন্দর শহর দখল করে নেয়, যা সৌদি সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের জন্য একটি বড় ধাক্কা। বিশ্লেষকরা এই ঘটনাকে গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আঞ্চলিক ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করছেন।
হুথিদের এই অগ্রগতিতে সৌদি আরব ক্রমেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ করে হুথিদের অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে মার্কিন সামরিক সহায়তা চেয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত সৌদি আরবের সামরিক হস্তক্ষেপের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে আসছে, কারণ ওয়াশিংটন লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচলের পথ খোলা রাখতে চায়, কিন্তু সৌদি আরব ও ইরান-সমর্থিত হুথিদের মধ্যকার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চায় না।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও এই বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি শনিবার বলেন, হুথিরা তার প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে যুক্তরাষ্ট্রকে ইয়েমেন যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার অনুরোধ জানিয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সোমবার জানান, ওয়াশিংটন সরাসরি হুথিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে, যদিও তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র এই আলোচনার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মূল স্বার্থের মধ্যে রয়েছে লোহিত সাগর ও এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সন্ত্রাসবাদ রপ্তানি প্রতিরোধ করা, আর ট্রাম্প প্রশাসন ইরান ও তার মিত্রদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এসব স্বার্থ রক্ষায় সুস্পষ্টভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হুথিরা তাদের সাম্প্রতিক সামরিক অর্জনকে কাজে লাগিয়ে সৌদি আরবের কাছ থেকে আরও বড় ছাড় আদায় করার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে থাকতে পারে সৌদি আরবের কাছ থেকে সরকারি খাতের বেতন প্রদানের অর্থায়ন, ইয়েমেনের তেল ও গ্যাস সম্পদ থেকে আয়ে প্রবেশাধিকার, এবং হুথি-নিয়ন্ত্রিত বন্দরগুলোতে বিমান ও জাহাজ চলাচলে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা না রাখা। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, অতীতে শক্তিশালী অবস্থানে থাকাকালে হুথিরা বারবার আরও ছাড়ের দাবি জানিয়েছে, তাই বর্তমানে কোনো সমঝোতা হলেও ইয়েমেন যুদ্ধ পুরোপুরি সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ভবিষ্যতে তারা আবারও উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও হুথিদের মধ্যকার এই কথিত সমঝোতা এখনো সরকারিভাবে নিশ্চিত করা হয়নি এবং উভয় পক্ষের কেউই প্রকাশ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করেনি। তবে এই প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সৌদি-হুথি সংঘাত তীব্র হলেও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক সংশ্লিষ্টতা এড়িয়ে কূটনৈতিক পথে নিজেদের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করছে।
