খেলাপি ঋণের চাপে ১৫ ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ২ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা
অনলাইন নিউজ ডেক্স
খেলাপি ঋণের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে দেশের কয়েকটি ব্যাংক। আয় কমে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে পারছে না কিছু ব্যাংক। এতে এসব ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা ও মূলধন পরিস্থিতির ওপর চাপ বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন প্রান্তিক শেষে সরকারি-বেসরকারি ১৫টি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৯ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ঘাটতি ৭৮ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। আর বেসরকারি ১০টি ব্যাংকের ঘাটতি ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
একই সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ এখন খেলাপি। খেলাপি ঋণ বাড়ায় ব্যাংকগুলোর প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাও বেড়েছে। কিন্তু আয় কমে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় অর্থ সংরক্ষণ করতে না পারায় কিছু ব্যাংকের আর্থিক ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, বিগত সরকারের সময়ে নামে-বেনামে ঋণ বিতরণের কারণে কয়েকটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে। এসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় প্রভিশনের প্রয়োজনীয়তাও বেড়েছে। কিন্তু আয় না থাকায় তারা প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারছে না। নিয়ম অনুযায়ী, প্রভিশন ঘাটতি থাকলে ব্যাংক মুনাফা ঘোষণা করতে পারে না।
রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে জনতা ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। জুন শেষে ব্যাংকটির ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের ১২ হাজার ৩৩৮ কোটি, রূপালী ব্যাংকের ১০ হাজার ৭৫৩ কোটি, বেসিক ব্যাংকের ৫ হাজার ৪৭ কোটি এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের প্রায় ৩৩ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে।
বেসরকারি ১০ ব্যাংকের মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের প্রভিশন ঘাটতি সবচেয়ে বেশি, ৮২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। ন্যাশনাল ব্যাংকের ঘাটতি ২৩ হাজার ৩২৬ কোটি এবং আইএফআইসি ব্যাংকের ২১ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা।
এ ছাড়া প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১১ হাজার ৯৭১ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৫ হাজার ৫ কোটি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ২ হাজার ৫৯৫ কোটি, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ২ হাজার ৯৫ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৬৪৫ কোটি, এনআরবিসি ব্যাংকের ৮২০ কোটি এবং এনআরবি ব্যাংকের ১৩০ কোটি টাকা প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে।
ব্যাংকের ঋণের মান অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। নিয়মিত ঋণের বিপরীতে দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ, সাব-স্ট্যান্ডার্ড ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক ঋণের বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা কুঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ প্রভিশন রাখতে হয়।
কোনো ঋণ আদায় না হলে ব্যাংক যাতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে না পড়ে, সে জন্যই এই অর্থ আলাদা করে সংরক্ষণ করা হয়। খেলাপি ঋণ বাড়লে প্রভিশনের প্রয়োজনও বাড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, জুন শেষে পুরো ব্যাংকিং খাতে প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল ৪ লাখ ৮৩ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলো সংরক্ষণ করেছে ২ লাখ ৬১ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। ফলে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা।
তবে সমস্যাগ্রস্ত ১৫ ব্যাংকের হিসাব আলাদাভাবে দেখলে তাদের ঘাটতি ২ লাখ ২৯ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। এর কারণ, কিছু ব্যাংক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পেরেছে। সেই অতিরিক্ত সংরক্ষণ সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের প্রভিশন ঘাটতি কিছুটা কমিয়েছে।
খেলাপি ঋণের এই চাপ শুধু ব্যাংকের আয় ও মুনাফায় সীমাবদ্ধ থাকছে না। প্রভিশন ঘাটতি দীর্ঘায়িত হলে ব্যাংকের মূলধন পরিস্থিতি দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি নতুন ঋণ বিতরণ ও আমানত সংগ্রহের সক্ষমতার ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে উচ্চ খেলাপি ঋণের পাশাপাশি প্রভিশন ঘাটতিও এখন ব্যাংকিং খাতের বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
