প্রকাশিতঃ সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬

ভারতকে টপকে যুক্তরাষ্ট্র এখন আমদানি পণ্যে দ্বিতীয় স্থানে, প্রথমে চীন


ভারতকে টপকে যুক্তরাষ্ট্র এখন আমদানি পণ্যে দ্বিতীয় স্থানে, প্রথমে চীন
ভারতকে টপকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য হ্রাস এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বৃদ্ধির ফলে এমন চিত্র দেখা গেছে। আর বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার এখনও চীন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১২ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যেখানে ভারতের সঙ্গে এই বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১০ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার। ফলে ভারতের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলারে এগিয়ে রয়েছে। এক বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি ৪৩ শতাংশ বেড়ে ২ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার থেকে ৩ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যেখানে ভারত থেকে আমদানি কমেছে প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ভারতে রপ্তানি কমেছে প্রায় ৩ শতাংশ। চুক্তি স্বাক্ষরের আগেই আমদানি বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তবে এই পরিসংখ্যানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সময়রেখা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি—অর্থাৎ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একেবারে শেষভাগে। এর অর্থ দাঁড়ায়, ওই অর্থবছরের প্রথম আট মাস কোনো চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা ছাড়াই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্বপ্রণোদিত হয়ে উচ্চ মূল্যে মার্কিন পণ্য আমদানি বাড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তির শর্ত না থাকা সত্ত্বেও এক অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি ৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার এই প্রবণতাকে পর্যবেক্ষকরা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী অবস্থানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকে পড়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। অর্থনীতিবিদদের আশংকা, চুক্তি স্বাক্ষরের আগেই যদি আমদানি এতটা বেড়ে থাকে, তাহলে চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা কার্যকর হওয়া চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির পরিমাণ আসলে কতটা বাড়তে পারে। ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় আগামী ১৫ বছরে প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য এবং প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য কেনার পরিকল্পনা রয়েছে, যা আসছে বছরগুলোতে আমদানির এই প্রবণতাকে আরও জোরালো করবে বলে তাদের আশঙ্কা। সেই প্রবণতার প্রাথমিক লক্ষণ ইতিমধ্যে স্পষ্ট। প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার মূল্যের বোয়িং বিমান ক্রয় চুক্তি এবং সরকারি খাতে উচ্চ মূল্যে এলএনজি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত—এই দুটি উদাহরণই ইঙ্গিত দেয়, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা থাকুক বা না থাকুক, দেশের বাজারে উচ্চ মূল্যের মার্কিন পণ্যের প্রভাব দিন দিন বাড়তেই থাকবে। রপ্তানি ও বাণিজ্য ভারসাম্যের প্রকৃত চিত্র এনবিআরের উপাত্ত থেকে হিসাব করলে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৯ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার। আমদানি (৩ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার) অপেক্ষা রপ্তানি অনেক বেশি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে প্রায় ৫ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত (সারপ্লাস) রয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্বৃত্তের হিসাব রপ্তানি আয়ের শক্তি নির্দেশ করলেও ক্রমবর্ধমান উচ্চ মূল্যের কৃষিপণ্য, জ্বালানি ও যন্ত্রপাতি আমদানির প্রতিশ্রুতি ভবিষ্যতে এই ভারসাম্যকে দ্রুত সংকুচিত করে দিতে পারে। চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন চীন ও ভারতের ক্ষেত্রে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশ্বের ৫৮টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘাটতি চীনের সঙ্গে—প্রায় ১৭ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার। ওই অর্থবছরে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল মাত্র ৬৯৪ দশমিক ৪৯ মিলিয়ন ডলার, বিপরীতে আমদানি হয়েছে প্রায় ১৮ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঘাটতি ভারতের সঙ্গে, প্রায় ৭ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার—মোট বাণিজ্যের হিসাবে যা প্রায় ৯ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলারের আমদানি ও মাত্র ১ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির ফল। অর্থাৎ চীন ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি অব্যাহত থাকা অবস্থায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৃষ্ট বাণিজ্য উদ্বৃত্তকে অনেকে স্বস্তির লক্ষণ হিসেবে দেখলেও, চুক্তি-পূর্ববর্তী সময়েই স্বপ্রণোদিত হয়ে উচ্চ মূল্যে মার্কিন পণ্য আমদানি বৃদ্ধির প্রবণতা এবং আসন্ন বছরগুলোতে চুক্তিভিত্তিক বাধ্যতামূলক আমদানির সম্ভাবনা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।