দ্রব্যমূল্যে নাভিশ্বাস চরমে নিম্ন আয়ের মানুষেঃ তবুও কোথাও দেখা মিলছে না ‘টিসিবির ট্রাকসেল’
অনলাইন নিউজ ডেক্স
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দামে যখন নিম্ন ও স্বল্প আয়ের মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে, তখন দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চোখে পড়ছে না ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) সেই পরিচিত ভ্রাম্যমাণ ট্রাক। ফলে বাজারদরের তুলনায় কম দামে তেল, চিনি ও ডাল কেনার যে সুযোগ নিম্নআয়ের মানুষের জন্য তৈরি হয়েছিল, সেটিও কার্যত সীমিত হয়ে পড়েছে।
সর্বশেষ গত মে মাসে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশজুড়ে বিশেষ ট্রাকসেল কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল টিসিবি। ১১ মে থেকে ২১ মে পর্যন্ত ১০ দিন ৭২০টি ট্রাকে ভর্তুকি মূল্যে ভোজ্যতেল, চিনি ও মসুর ডাল বিক্রির কথা জানানো হয়েছিল। ওই কর্মসূচিতে সাধারণ ভোক্তারাও পণ্য কেনার সুযোগ পেয়েছিলেন।
এরপর নিয়মিতভাবে সেই ট্রাকসেল আর চালু হয়নি। জুনের শুরুতে চট্টগ্রামে টিসিবির ট্রাকসেল বন্ধ হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। ৩১ মে থেকে ট্রাকে পণ্য বিক্রি বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে তখনও টিসিবির ফ্যামিলি কার্ডধারীদের জন্য নিয়মিত ভর্তুকিমূল্যের পণ্য সরবরাহ চালু থাকার কথা বলা হয়েছিল।
বাজারে দাম বাড়ছে, কম দামের ট্রাক নেই
টিসিবির ট্রাকসেল বন্ধ থাকার সময়েই বাজারে নিত্যপণ্যের দামে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ঢাকার বাজারে খোলা চিনি কেজিতে ১১৫ থেকে ১২০ টাকা এবং প্যাকেটজাত চিনি ১২০ থেকে ১২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একই সময়ে আটা ও ময়দার দামও বেড়েছে।
ভোজ্যতেলের বাজারেও সরবরাহ সংকটের খবর এসেছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে রাজধানীর বিভিন্ন বাজার পরিদর্শনে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ার পাশাপাশি চিনির দাম বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া যায়।
এদিকে আগস্টে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকার বাজারে আটার দাম কেজিতে ৮০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিও তখন ৭ শতাংশের ওপরে ছিল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে আগস্টে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ২ শতাংশ।
ট্রাকসেলের অপেক্ষায় নিম্নআয়ের মানুষ
টিসিবির ট্রাকসেল ছিল ফ্যামিলি কার্ডের বাইরে থাকা সাধারণ নিম্নআয়ের মানুষের জন্যও তুলনামূলক কম দামে নিত্যপণ্য কেনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। ২০২৬ সালের রমজান মাসে টিসিবির ট্রাক থেকে তেল, ডাল, চিনি, ছোলা ও খেজুর কিনতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানোর খবরও প্রকাশিত হয়েছিল। অনেক ক্রেতা কয়েকশ টাকা সাশ্রয়ের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছেন।
২০২৫ সালেও টিসিবির ট্রাকের সামনে নিম্নআয়ের মানুষের দীর্ঘ সারি এবং ট্রাক সময়মতো না আসায় ক্রেতাদের ফিরে যাওয়ার ঘটনা সংবাদে উঠে এসেছিল।
ফলে বাজারে যখন নিম্নআয়ের মানুষের চাহিদা বাড়ছে, তখন ট্রাকসেল কেন নিয়মিত রাখা হচ্ছে না—এ প্রশ্নও উঠছে।
বছরে কয়েক দফা ট্রাকসেল, কিন্তু প্রয়োজন সারা বছর
টিসিবির ট্রাকসেল মূলত বিশেষ পরিস্থিতিতে পরিচালিত একটি কর্মসূচি। ২০২৫ সালের কার্যক্রম নিয়ে টিসিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, সাধারণ মানুষের জন্য ট্রাকসেল বছরে কয়েকটি বিশেষ সময়ে পরিচালিত হয়েছে, নিয়মিত মাসিক ভিত্তিতে নয়। বাজেটের সীমাবদ্ধতা ও ভর্তুকির চাপকেও এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে টিসিবির ভর্তুকি কার্যক্রমে প্রায় ১ হাজার ৪১২ কোটি টাকার ঘাটতির তথ্য প্রকাশিত হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ওই অর্থ ছাড়ের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করেছিল।
তবে এরই মধ্যে আগস্টে টিসিবি চলতি অর্থবছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার নিত্যপণ্য কেনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। তেল, ডাল ও চিনি থাকছে এই ক্রয় পরিকল্পনার প্রধান পণ্যের তালিকায়।
অর্থাৎ একদিকে বাজারে নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য ও সরবরাহ সংকট, অন্যদিকে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য কম দামের পণ্যের চাহিদা—দুই বাস্তবতার মধ্যেই প্রশ্ন উঠছে, টিসিবির ট্রাকসেল আবার নিয়মিতভাবে কবে মাঠে নামবে?
চাল-আটার ক্ষেত্রে আরেক কর্মসূচি
তবে চাল ও আটার ক্ষেত্রে টিসিবির ট্রাকসেলের সঙ্গে খাদ্য অধিদপ্তরের ওএমএস (Open Market Sale) কর্মসূচিকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ওএমএসের মাধ্যমে চাল ও আটা কম দামে বিক্রির আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে।
তারপরও সাধারণ মানুষের কাছে টিসিবির ট্রাকসেল একটি দৃশ্যমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি হিসেবে পরিচিত। ফলে কয়েক মাস ধরে রাস্তায় সেই ট্রাক না থাকায় বাজারের বাড়তি দামের চাপে থাকা নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে।
