চলতি বছরের ২৮শে জানুয়ারি ঢাকা মহানগর পুলিশের যাত্রাবাড়ী থানার একটি পুলিশ ফাঁড়ির টয়লেট থেকে কনস্টেবল শফিকুল ইসলামের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মৃত্যুর আগে মেয়ের মোবাইল ফোনে একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন তিনি। সেখানে লিখেছিলেন, ‘আমি তোমার জন্য কিছুই করতে পারলাম না। আমাকে ক্ষমা করে দিও…।’ কিন্তু মেয়ের জন্য ঠিক কী করতে চেয়েছিলেন শফিকুল, কেন তা করতে পারেননি কিংবা কী পরিস্থিতিতে তাকে আত্মহত্যার মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আর কোনো তদন্ত হয়নি।
শফিকুল ইসলামের ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। কয়েক দিন পরপরই পুলিশ বাহিনীর কোনো না কোনো সদস্যের আত্মহত্যার খবর সামনে আসে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে এসব ঘটনার পেছনে হতাশা, পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহ, মানসিক চাপ কিংবা মানসিক অশান্তির কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু কেন একজন পুলিশ সদস্য হতাশায় ভুগছেন, পরিবারের সঙ্গে তার বিরোধের কারণ কী, কিংবা কোন ধরনের কর্মপরিবেশ ও মানসিক চাপ তাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান করা হয় না। এমনকি এ বিষয়ে বাহিনীর মধ্যে কার্যকর গবেষণারও ঘাটতি রয়েছে।
আত্মহননের ঝুঁকিতে থাকা সদস্যদের চিহ্নিত করে তাদের সেই পথ থেকে ফিরিয়ে আনার মতো কোনো কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি। মানুষের সংকট মোকাবিলায় যাদের দায়িত্ব, সেই পুলিশ সদস্যরাই আবার নিজেদের সংকট সামাল দিতে না পেরে আত্মহত্যাকে বেছে নিচ্ছেন।
কনস্টেবল থেকে এএসআই ও এসআই পদমর্যাদার কয়েকজন পুলিশ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মানসিক চাপ, বিষণ্নতা, পারিবারিক অশান্তি কিংবা দাম্পত্য কলহের মধ্যে থাকলেও তারা এসব নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে স্বস্তি বোধ করেন না। অনেক সময় মানসিকভাবে সমস্যায় থাকার বিষয়টি বুঝতে পারলেও চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন না।
তাদের আশঙ্কা, মানসিক চিকিৎসা নিলে কর্মক্ষেত্রে তাদের ‘অসুস্থ’ হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। এর ফলে পদোন্নতি কিংবা পছন্দের পদায়ন থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয় কাজ করে। একইভাবে পারিবারিক বা দাম্পত্য জীবনের সমস্যাও তারা প্রকাশ করতে চান না। দিনের পর দিন এসব চাপ জমতে থাকায় কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নিচ্ছেন।
আত্মহত্যা প্রতিরোধের জন্য পুলিশ বাহিনীর নিজস্ব কোনো প্রতিষ্ঠান বা কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেই। অথচ আত্মহত্যা প্রতিরোধ নিয়ে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিষয়টির প্রতি আন্তর্জাতিক মনোযোগ তৈরির লক্ষ্যে প্রতিবছর আন্তর্জাতিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস পালন করা হয়।
আন্তর্জাতিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ সমিতি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ উদ্যোগে প্রতিবছর ১০ই সেপ্টেম্বর দিবসটি পালিত হয়। জাতীয়ভাবে এ দিবসটি পালন না হলেও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান আগামীকাল ১০ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে দিবসটি পালন করবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৫৬ জন পুলিশ সদস্য আত্মহনন করেছেন। তাদের মধ্যে নারী সদস্যের সংখ্যা ১১। এরপর সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য যুক্ত করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালে আরও ১৩ জন পুলিশ সদস্য আত্মহত্যা করেন। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত আত্মহত্যা করেছেন আরও ৮ জন।
সব মিলিয়ে গত সাড়ে সাত বছরে ৭৫ জন পুলিশ সদস্য আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। আত্মহননকারী সদস্যদের মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি কনস্টেবল।
এ তালিকায় একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, একজন সহকারী পুলিশ সুপার, একজন পরিদর্শক, তিনজন এসআই এবং একজন নায়েকও রয়েছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের তালিকা বিশ্লেষণ করে আত্মহত্যার পদ্ধতিতেও একটি চিত্র পাওয়া যায়। আত্মহত্যা করা পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ৩০ জন গলায় ফাঁস দিয়ে, ১৩ জন বিষপানে, একজন গলা কেটে, ১০ জন নিজের অস্ত্রের গুলিতে এবং দুজন ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ১২ জন পুলিশ সদস্য আত্মহত্যা করেন। ২০২০ সালে এই সংখ্যা ছিল ১১ জন এবং ২০২১ সালে ৯ জন। ২০২২ সালে আত্মহত্যা করেন ছয়জন পুলিশ সদস্য। তবে পরের বছর, অর্থাৎ ২০২৩ সালে সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ জনে।
২০২৪ সালে আত্মহত্যা করেন তিনজন পুলিশ সদস্য। এরপর ২০২৫ সালে আবারও ১৩ জন সদস্য আত্মহত্যা করেন। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত আত্মহত্যা করেছেন আরও আটজন।
‘পারিবারিক কলহে’ আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি
পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাওয়া ২০১৯ সাল থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আত্মহত্যা করা ৫৬ জন পুলিশ সদস্যের মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি সদস্য আত্মহত্যা করেছেন পারিবারিক কলহের কারণে। পুলিশের প্রতিবেদনে ২৫ জনের আত্মহত্যার পেছনে পারিবারিক কলহকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মানসিক অশান্তি, মানসিক সমস্যা কিংবা মানসিক চাপ। এ কারণে আত্মহত্যা করেছেন ১১ জন। দাম্পত্য সমস্যার কারণে পাঁচজন এবং প্রেমে ব্যর্থ হয়ে চারজন আত্মহত্যা করেছেন।
এ ছাড়া আর্থিক অনটনের কারণে দুজন, জুয়ায় আসক্তির কারণে একজন এবং মাদকাসক্তির কারণে একজন আত্মহত্যা করেন। বাকি পাঁচজনের আত্মহত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।
পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, পুলিশ সদস্যদের মানসিক চাপ ও বিভিন্ন ধরনের সংকট মোকাবিলায় কল্যাণ প্যারেড, সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সহযোগিতা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
তার ভাষ্য, পুলিশ সদস্যদের কর্মপরিবেশ, কল্যাণ এবং মানসিক সুস্থতার বিষয়গুলোকে এখন আরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো, সংকটের মধ্যে থাকা কোনো সদস্য যেন দ্রুত প্রয়োজনীয় সহায়তা পান। বাংলাদেশ পুলিশে কল্যাণমূলক ব্যবস্থা ও চিকিৎসা সহায়তার সুযোগও রয়েছে বলে জানান তিনি।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী সাইফুদ্দীন বলেন, পুলিশের কোনো সদস্য আত্মহত্যা করলে ঘটনাটি সবার নজরে আসে। কিন্তু একজন আত্মহত্যা করার পাশাপাশি আরও অন্তত পাঁচজনের মধ্যে একই ধরনের প্রবণতা থাকতে পারে—এই বিষয়টি সাধারণত সামনে আসে না। এ কারণে পুলিশ বাহিনীর সব সদস্যের নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন এবং সেটি ব্যক্তিনির্ভর না হয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই চালু করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, পুলিশের কোনো সদস্য মানসিক অশান্তিতে থাকলে জনগণ তার কাছ থেকে প্রত্যাশিত সেবা পাবে না। আর তিনি যেহেতু অস্ত্রধারী বাহিনীর সদস্য, তাই বিষয়টির ঝুঁকি আরও বেশি। ফলে বাহিনীর স্বার্থেই প্রতিটি পুলিশ সদস্যের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য সরকারেরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
‘কলহ’ দেখিয়েই কি শেষ হয় তদন্ত?
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানে পারিবারিক কলহকে আত্মহত্যার সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখানো হলেও মাঠপর্যায়ে কর্মরত ঢাকা মহানগর পুলিশের কনস্টেবল থেকে এসআই পদমর্যাদার অন্তত ১৫ জন সদস্যের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন একটি চিত্র পাওয়া গেছে।
তাদের বক্তব্য, কোনো পুলিশ সদস্য আত্মহত্যা করলে পারিবারিক বা দাম্পত্য কলহ এবং মানসিক অশান্তির তথ্য উল্লেখ করে অপমৃত্যুর মামলাটি নিষ্পত্তি করা হয়। কিন্তু কী ধরনের পারিবারিক বা দাম্পত্য কলহ ছিল, সেই অশান্তির প্রকৃত কারণ কী কিংবা এর সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না—এসব বিষয় আর সামনে আসে না। ফলে সমস্যার মূল কারণও অজানা থেকে যায় এবং তা প্রতিরোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না।
একজন কনস্টেবল ও দুজন এএসআই জানান, পুলিশের দায়িত্ব পালনের জন্য মূলত নির্দিষ্ট কোনো কর্মঘণ্টা নেই। প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে হয় তাদের। ডিউটি শেষে ঘটনাস্থল থেকে বাসা কিংবা ব্যারাকে ফিরতে পারবেন কি না, ফিরলেও ব্যারাকে পর্যাপ্ত বিশ্রামের জায়গা পাবেন কি না—এসব নিয়েও তাদের দুশ্চিন্তা থাকে। ব্যারাকে জায়গা পাওয়া গেলেও অনেক সময় সেখানে বসবাসের উপযোগী পরিবেশ থাকে না। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে বাধ্য হওয়ার পাশাপাশি উন্নতমানের খাবারও সবসময় পাওয়া যায় না। এর সঙ্গে রয়েছে সন্তানের পড়াশোনা, সংসারের খরচসহ নানা আর্থিক ও পারিবারিক দায়িত্ব। সবকিছু মিলিয়ে কর্মরত অনেক পুলিশ সদস্যই সারাক্ষণ এক ধরনের মানসিক অশান্তির মধ্যে থাকেন।
মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের আরও অভিযোগ, তারা যোগ্যতা অর্জন করেও অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে পদোন্নতি পান না। পদোন্নতির জন্য যোগ্য হলেও পদ শূন্য না থাকায় তাদের অপেক্ষা করতে হয়। আবার বদলির ক্ষেত্রেও অনেক সময় আর্থিকভাবে ‘ম্যানেজ’ করার প্রয়োজন পড়ে বলে তারা জানান।
প্রয়োজন অনুযায়ী ছুটি পাওয়া যায় না। বিনোদন, খেলাধুলা কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পর্যাপ্ত সুযোগও নেই। এসব কারণে তাদের ওপর চাপ তৈরি হয়। সেই চাপ দীর্ঘদিন বহন করতে না পেরে কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
ছয় বছর আগের গবেষণাতেও উঠে এসেছিল একই চিত্র
মাঠপর্যায়ে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের বর্তমান অভিযোগগুলো নতুন নয়। প্রায় ছয় বছর আগে পুলিশ সদর দপ্তরের পরিচালিত একটি গবেষণাতেও একই ধরনের সমস্যার কথা উঠে এসেছিল। ২০২০ সালে পুলিশ সদর দপ্তর বাহিনীতে সংস্কারের লক্ষ্যে একটি উদ্যোগ নেয়।
‘রূপকল্প ২০২১ ও রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়ন’ এবং ‘জনগণের পুলিশ’ গঠনের লক্ষ্য সামনে রেখে নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, ছুটি, আবাসন, চিকিৎসা, সন্তানদের শিক্ষা, আচরণ, দুর্নীতি এবং নারী পুলিশ সদস্যদের সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধানের জন্য ওই গবেষণা পরিচালনা করা হয়।
গবেষণায় অংশ নেওয়া পুলিশ সদস্যরা নিজেদের স্বাস্থ্য ও কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়ে ১৩ ধরনের মতামত দেন। তাদের সুপারিশের মধ্যে ছিল নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা চালু করা, অতিরিক্ত দায়িত্বের জন্য ওভারটাইম ভাতা দেওয়া, স্বাস্থ্যসম্মত থাকা ও খাওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করা, বার্ষিক ছুটির পরিমাণ বাড়ানো, চিকিৎসাব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা।
ওই গবেষণার ভিত্তিতে পুলিশ সদস্যদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে চিকিৎসাব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বেশ কিছু প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব প্রস্তাবের কোনোটি বাস্তবায়িত হয়নি।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক জানান, তাদের চলমান একটি গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক পর্যন্ত পুলিশ সদস্যদের গড় আয়ু তুলনামূলকভাবে কম। সাধারণ মানুষের গড় আয়ু ৭২ বছরের বেশি হলেও পুলিশ সদস্যদের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৬০ বছর।
মানসিক সমস্যায় ভুগলেও পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই
পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাহিনীতে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তেমন কোনো কার্যক্রম নেই। কোনো ইউনিটেই মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ বা নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা নেই। প্রায় সোয়া দুই লাখ পুলিশ সদস্যের জন্য ঢাকার কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে একটি মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগ থাকলেও সেখানে স্থায়ী কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, পুলিশ সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য ও মানসিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত কোনো সমন্বিত বা প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণাও হয়নি।
তবে প্রায় এক বছর আগে পুলিশের একজন কর্মকর্তা ব্যক্তিগত উদ্যোগে পুলিশ সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে একটি জরিপ পরিচালনা করেন। বিভিন্ন পদমর্যাদার ২৯২ জন পুলিশ সদস্য ওই জরিপে অংশ নেন।
ফলাফলে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের ৯৮ শতাংশই মনে করেন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তারা কোনো না কোনো ধরনের মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন। পরিবারের সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় কাটাতে না পারার কারণে মানসিক চাপ অনুভব করেন বলে মনে করেন অন্তত ৯১ শতাংশ। অন্যদিকে ৮৩ শতাংশ পুলিশ সদস্য জানান, দায়িত্ব পালনের কারণে রাতে তাদের ঘুমের সমস্যা হয়। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে কাউন্সেলিং প্রয়োজন বলে মনে করেন অন্তত ৯৫ শতাংশ সদস্য।
চাকরিবিধির কথা উল্লেখ করে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের ওই কর্মকর্তা বলেন, বিশ্বের প্রায় সব দেশেই পুলিশি পেশা চাপপূর্ণ। তবে বাংলাদেশের পুলিশ সদস্যদের ওপর এই চাপ তুলনামূলকভাবে আরও বেশি। চাকরির শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কনস্টেবল ও এসআইদের বিয়ে করতে হয়। এর পাশাপাশি প্রেমিকা বা পরিবারের পক্ষ থেকেও বিয়ের চাপ থাকে। একাধিক চাপ একসঙ্গে সামলাতে না পেরে কেউ কেউ আত্মহননের মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন।
তার মতে, দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে হয়—এমন পেশা খুব বেশি নেই। পুলিশের দীর্ঘ কর্মঘণ্টার কারণে সময়ের সঙ্গে সদস্যদের সঙ্গে পরিবারের দূরত্ব তৈরি হয়। সেই দূরত্ব ধীরে ধীরে পারিবারিক কলহ কিংবা সম্পর্কের অবনতির দিকে যেতে পারে। আর এসব চাপের চূড়ান্ত পরিণতি কখনো কখনো আত্মহত্যা হয়ে দাঁড়ায়।
পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, কোনো সদস্য মানসিক চাপ কিংবা বিষণ্নতার মধ্যে থাকলেও সাধারণত সে বিষয়ে মুখ খোলেন না। ফলে সমস্যা শুরু হওয়ার পর যথাসময়ে সহায়তা না পাওয়ায় তারা ধীরে ধীরে আত্মহননের ঝুঁকির দিকে এগিয়ে যেতে পারেন।
পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, একজন পুলিশ সদস্যের মানসিক সমস্যা হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু নানা কারণে তিনি সেটি প্রকাশ করেন না। পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য সমস্যা কিংবা অন্য কোনো কারণে মানসিক সমস্যা দেখা দিলে তার পদোন্নতি আটকে যেতে পারে বা ভালো পদায়ন নাও মিলতে পারে—এমন আশঙ্কা সদস্যদের মধ্যে কাজ করে। তাই মানসিক চাপ থাকলেও তারা অনেক সময় নীরব থাকেন।
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমান খান বলেন, পুলিশ সদস্যদের আত্মহত্যার প্রবণতা কমাতে একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক, মানসিক স্বাস্থ্য এবং নীতিগত—এই তিন পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। আত্মহত্যার ঘটনা কমাতে পুলিশ সদস্যদের কর্মপরিবেশ এবং বাহিনীর ব্যবস্থাপনায় দ্রুত পরিবর্তন আনা জরুরি।
তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ মানসিক স্বাস্থ্য নীতিমালা প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি।
তথ্যসূত্র: কালবেলা
