রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা বন্ধ, আমদানি ব্যয় সমন্বয়ে সারের দাম বৃদ্ধি: বিপর্যয়ে কৃষি, ব্যাহত শস্য উৎপাদন
প্রধান সম্পাদক
দেশের সাতটি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানার সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা বছরে ৩৭ লাখ টনের বেশি হলেও গ্যাস-সংকটের কারণে চলতি অর্থবছরে তা নেমে এসেছে মাত্র ১১ লাখ টনে—অর্থাৎ সক্ষমতার মাত্র ৩০ শতাংশ।
ঠিক এই সময়েই কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৈশ্বিক বাজারদর ও আমদানি ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সারের দাম কেজিপ্রতি বাড়ানো হয়েছে। দুই দিক থেকে আসা এই চাপে আমন মৌসুমের মাঝপথে দেশের কৃষক এখন সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন।
দেশের মোট সার চাহিদার ৮৫ শতাংশের বেশি এখন আমদানির মাধ্যমে মেটাতে হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলো গ্যাস সরবরাহের অভাবে সক্ষমতার এক-তৃতীয়াংশও উৎপাদন করতে না পারায় আমদানি-নির্ভরতা আরও বেড়েছে।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য অস্থিরতা হলেই তার প্রভাব সরাসরি দেশের বাজারে এসে পড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালীতে অনিশ্চয়তার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকেই ১২ শতাংশ বেড়েছে, এবং পুরো বছরে তা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে।
এই পরিস্থিতিতে সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) একাধিক আন্তর্জাতিক টেন্ডার বাতিল করে নতুন করে চীন, মিসর, রাশিয়াসহ বিকল্প উৎস থেকে সার আমদানির চেষ্টা চালাচ্ছে।
এই বাস্তবতাতেই কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিশ্ববাজারে ক্রমবর্ধমান দাম ও আমদানি ব্যয় সমন্বয় করে, আমদানি যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে এবং সারের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতেই দেশের বাজারে কেজিপ্রতি দাম বাড়ানো হয়েছে।
সরকারি হিসাবে মজুদ পর্যাপ্ত থাকার দাবি করা হলেও মাঠচিত্র ভিন্ন কথা বলছে। কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন জেলার কৃষকরা অভিযোগ করেছেন, ডিলার পয়েন্টে চাহিদামতো সার মিলছে না, আর খোলাবাজারে বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত তিনশ থেকে সাতশ টাকা গুনতে হচ্ছে।
কোথাও কোথাও ক্ষুব্ধ কৃষকরা সড়ক অবরোধ করেছেন, এমনকি গুদাম থেকে সার নিয়ে গেছেন এমন ঘটনাও ঘটেছে।
কৃষি মন্ত্রী নিজেই এই বিশৃঙ্খলাকে “পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র” আখ্যা দিয়েছেন, যদিও এর পেছনে কারা জড়িত তা নির্দিষ্ট করে বলেননি।
অর্থনীতিবিদ এম আসাদুজ্জামান মনে করেন, বৈশ্বিক বাজারদর বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শর্ত পূরণের প্রয়োজনে সরকারকে জ্বালানি ও সারসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি কমিয়ে দাম বাড়াতে হচ্ছে।
তবে তিনি সতর্ক করেছেন, এতে কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে, আর এই বাড়তি খরচের হিসাব রাখা এবং কৃষকদের তা সামলানোর সুযোগ দেওয়া জরুরি।
দেশের মোট সার ব্যবহারের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ব্যয় হয় ধান চাষে, আর উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাত এখন শুধু বোরো নয়, আমনেও ছড়িয়ে পড়ায় সার এখন পানির চেয়েও বড় সীমাবদ্ধতা হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা।
সরবরাহ-বিশৃঙ্খলা ও মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘায়িত হলে চলতি আমন মৌসুমের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আসন্ন বোরো ও শীতকালীন সবজি মৌসুমেও এর প্রভাব পড়তে পারে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে।
